কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি, পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক স্থান। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের নামে এই শহরের নামকরণ করা হয়েছে। ইতিহাস, স্থাপত্য এবং লোকগাথার জন্য এই রাজবাড়ি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

রাজবাড়ির ইতিহাস:

নদিয়ারাজ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ভবানন্দ মজুমদার। তবে এই রাজবাড়ির খ্যাতি এবং প্রসার ঘটে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের (১৭২৮-১৭৮২) আমলে। তিনি ছিলেন বিদ্যোৎসাহী এবং শিল্পানুরাগী। তাঁর রাজসভায় বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বের সমাগম ঘটত, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিখ্যাত কৌতুকশিল্পী গোপাল ভাঁড়।

পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সাহায্য করার জন্য মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে ব্রিটিশ সরকার ‘মহারাজা’ উপাধি প্রদান করে। এই রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ভ্রমণ অভিজ্ঞতা:

বর্তমানে রাজবাড়ির মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হলেও এর ঐতিহ্য আজও অক্ষুণ্ণ। পর্যটকদের জন্য মূল ভবনটির ভেতরে প্রবেশ সীমিত। তবে বাইরে থেকে এর স্থাপত্যশৈলী এবং পুরনো দিনের কারুকার্য দেখা যায়।

 * ঠাকুরদালান: রাজবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হলো এর ঠাকুরদালান। এখানে এখনও ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এটি বাংলার অন্যতম প্রাচীন বনেদি পুজো হিসেবে পরিচিত। দুর্গাপূজার সময় এখানে প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় হয়। এখানকার দুর্গাপ্রতিমা ‘রাজরাজেশ্বরী’ নামে পরিচিত।

 * স্থাপত্য: রাজবাড়ির স্থাপত্যে মুঘল ও ইউরোপীয় শৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়। বিশাল থাম, খিলান এবং পঙ্খের কাজ এখানকার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

 * রাজবাড়ির মেলা: প্রতি বছর দোল পূর্ণিমার পর চৈত্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে বিরাট ‘বারোদোল’ মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলাটি দেখতে বহু দূর থেকে পর্যটকরা আসেন।

ভ্রমণের সময়সূচি ও টিকিট মূল্য:

সাধারণত রাজবাড়িটি পর্যটকদের জন্য সবসময় খোলা থাকে না। তবে বিশেষ উৎসব, যেমন – দুর্গাপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা এবং বারোদোল মেলার সময় রাজবাড়ির ভেতরে দর্শকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। অন্যান্য সময় বাইরে থেকে রাজবাড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করা যেতে পারে। রাজবাড়ি পরিদর্শনের জন্য কোনো টিকিট মূল্য সাধারণত লাগে না।

আশেপাশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান:

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পাশাপাশি কৃষ্ণনগরে আরও কিছু আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে যা আপনি ঘুরে দেখতে পারেন:

 * ঘূর্ণি: কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মাটির পুতুলের জন্য ঘূর্ণি গ্রামটি বিশ্ববিখ্যাত। এখানে বহু মৃৎশিল্পীর বাড়িতে গিয়ে তাদের কাজ দেখতে ও মাটির জিনিসপত্র কেনা যায়।

 * মা আনন্দময়ী কালী মন্দির: এই মন্দিরটি শহরের অন্যতম বিখ্যাত মন্দির।

 * জগদ্ধাত্রী পূজা: কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পূজা অত্যন্ত বিখ্যাত। বিশেষ করে কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে এই উৎসব দেখতে বহু মানুষ আসেন।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। যারা ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভালোবাসেন, তাদের জন্য কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি ভ্রমণ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কিভাবে এখানে আসবেন

 * রেলপথে: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর লোকাল ট্রেনে করে সহজেই কৃষ্ণনগর জংশন স্টেশনে পৌঁছানো যায়। স্টেশন থেকে রিকশা বা টোটোয় করে রাজবাড়ি যাওয়া যায়।

 * সড়কপথে: কলকাতা থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কৃষ্ণনগর পৌঁছানো যায়। জাতীয় সড়ক ১২ ধরে সহজেই এখানে আসা যায়।

Google Maps

Scroll to Top