নবদ্বীপের পোড়া মা তলা

নবদ্বীপের পোড়ামা কালীমন্দির বা পোড়ামাতলা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার নবদ্বীপ শহরের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও জাগ্রত স্থান। এটি নবদ্বীপের অন্যতম আকর্ষণীয় তীর্থস্থান। পোড়ামাতলা শুধুমাত্র একটি মন্দির নয়, এটি নবদ্বীপের ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্থানটি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত জাগ্রত দেবী হিসেবে পরিচিত।

১. স্থান ও পরিচিতি:

 * অবস্থান: এটি নবদ্বীপ শহরের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত।

 * দেবী: পোড়ামা হলেন নবদ্বীপের অধিষ্ঠাত্রী লৌকিক দেবী। তিনি মূলত দক্ষিণাকালীর ধ্যানেই সারাবছর পূজিত হন।

 * বিগ্রহ: মন্দির প্রাঙ্গণে একটি বিশাল বটবৃক্ষের নীচে দেবীর ঘট বা আধার স্থাপন করে পূজা করা হয়। প্রচলিত আছে, অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর মূল বটগাছের দুটি মাত্র ইট অবশিষ্ট ছিল, যার উপরে ঘট স্থাপন করা হয়। (যদিও বর্তমানে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্র গিরিশচন্দ্র কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কষ্টিপাথরের কালীবিগ্রহও রয়েছে বলে কিছু সূত্র দাবি করে, তবে বটবৃক্ষের নীচে ঘট-পুজাই বেশি পরিচিত)।

 * ঐতিহাসিক গুরুত্ব: পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে পোড়ামাতলাকে নবদ্বীপের হেরিটেজ স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এটি একসময় নবদ্বীপের পণ্ডিত-বিদ্বজ্জনেরা সংস্কৃতচর্চা ও বিতর্কসভার আয়োজন করতেন।

২. মন্দিরের অলৌকিক কাহিনী (প্রচলিত মত):

 * পোড়ামা নাম: কথিত আছে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম নবদ্বীপের এক বটবৃক্ষতলে দক্ষিণাকালীর ঘট স্থাপন করেন। কোনো এক সময় বটগাছটি অগ্নিদগ্ধ (পোড়া) হয়ে গেলে এই কালী ‘পোড়ামা’ নামে পরিচিত হন।

 * অন্য এক মত অনুসারে, রামভদ্র সিদ্ধান্তবাগীশ নামক এক সাধকের সাধনাস্থল এই বটবৃক্ষটি একবার আগুনে পুড়ে যায়। সেই সাধক মন্ত্রের শক্তিতে আগুন নিভিয়ে নিজে রক্ষা পান, কিন্তু মন্দিরের কেবল দুটি ইট অবশিষ্ট থাকে। এই ইট দুখানা আজও পোড়ামা’র আধার হয়ে রয়েছে।

 * অনেকের বিশ্বাস, দেবী স্বয়ং বটবৃক্ষের কোটরে বিরাজ করেন।

৩. মন্দিরের অন্যান্য আকর্ষণ:

 * ভবতারণ শিব ও ভবতারিনী কালী মন্দির: পোড়ামা মন্দিরের পাশেই ভবতারণ শিব (বিশাল শিবলিঙ্গ) এবং ভবতারিনী কালীর মন্দিরও অবস্থিত।

 * বটবৃক্ষ: মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে বিশাল বটবৃক্ষটি একটি প্রধান আকর্ষণ। ভক্তরা বটগাছটিকে প্রদক্ষিণ করে এবং মনস্কামনা পূরণের জন্য লাল সুতোয় ঢিল বেঁধে দেন।

৪. পূজার বিশেষত্ব:

 * নিত্য পূজা: প্রতিদিন দক্ষিণাকালীর নিয়মনীতি ও পূজা পদ্ধতিতেই দেবীর পূজা হয়।

 * বিশেষ পূজা: সরস্বতী পূজার দিন শ্রীপঞ্চমী তিথিতে দেবী নীল সরস্বতী রূপে পূজিত হন এবং এই দিনে বিশেষ উৎসব হয়।

 * রাস উৎসব: নবদ্বীপের বিখ্যাত রাস উৎসবের সময় সব শোভাযাত্রা প্রথা মেনে পোড়ামা’কে পূজা দিতে আসে।

৫. দর্শন/ভ্রমণের টিপস:

 * পোড়ামাতলা নবদ্বীপ বাজারের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এলাকাটি বেশ জনবহুল।

 * মন্দিরের আশেপাশে পূজার সামগ্রী, প্রসাদ এবং স্থানীয় কিছু খাবার (যেমন কচুরি ও আলুর দম) পাওয়া যায়।

 * নবদ্বীপের অন্যান্য তীর্থস্থান, যেমন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান, সোনার গৌরাঙ্গ মন্দির, সমাজবাড়ি আশ্রম ইত্যাদিও কাছাকাছি অবস্থিত, যা একসঙ্গে ভ্রমণ করা সুবিধাজনক।

Google Maps

কিভাবে এখানে আসবেন

 * রেলপথ: নবদ্বীপ ধাম রেলওয়ে স্টেশন (Nabadwip Dham Railway Station) থেকে টোটো বা রিকশা করে সরাসরি পোড়ামাতলা যাওয়া যায়। এটি নবদ্বীপ শহরের বাজার এলাকার কাছেই অবস্থিত।

 * সড়কপথ: কৃষ্ণনগর বা অন্যান্য নিকটবর্তী শহর থেকে সড়কপথে নবদ্বীপ এসে স্থানীয় যানবাহনে পোড়ামাতলা পৌঁছানো যায়।

 * স্থানীয় পরিবহন: নবদ্বীপ শহরে টোটো/অটো বা রিকশা সহজলভ্য, যার সাহায্যে পোড়ামাতলা পৌঁছানো যায়।

Scroll to Top