ঘূর্ণির মাটির পুতুল

পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরের ঘূর্ণি অঞ্চলটি বিশ্বজুড়ে তার মৃৎশিল্প এবং মাটির পুতুলের জন্য বিখ্যাত। এটি মূলত একটি মৃৎশিল্পীদের উপনিবেশ, যা স্থানীয়ভাবে পুতুলপট্টি নামে পরিচিত। ঘূর্ণি হল এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ধারক ও বাহক, যেখানে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় মাটির মূর্তি গুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

 * সূচনা: কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল শিল্পের ইতিহাস প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো। শোনা যায়, নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়-এর (১৭১০-১৭৮৩) পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্পের সূচনা হয়।

 * শিল্পীদের আগমন: জনশ্রুতি আছে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তৎকালীন পূর্ব বাংলার নাটোর থেকে একদল দক্ষ মৃৎশিল্পীকে কৃষ্ণনগরে আনিয়েছিলেন এবং তারা জলঙ্গী নদীর তীরে অবস্থিত ঘূর্ণি অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। যদিও অন্য মতানুসারে, শিল্পীরা স্থানীয় কুমোর ছিলেন এবং ইংরেজ ও খ্রিস্টান মিশনারিদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুতুল বানানো শুরু করেন।

 * শিল্পের প্রসার: প্রথমদিকে দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি হলেও, রাজার উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মৃৎশিল্পীরা নানা ধরনের মানুষের মূর্তি, পশুপাখি, ফল-সবজি এবং দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য অবলম্বনে সূক্ষ্ম কারুকার্যময় মাটির পুতুল তৈরি শুরু করেন।

 * আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ১৮৫১ সালে লন্ডনের এক প্রদর্শনীতে ঘূর্ণির শিল্পী শ্রীরাম পালের তৈরি পুতুল স্থান পেলে এই শিল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

পুতুল তৈরির পদ্ধতি

ঘূর্ণির পুতুলগুলি প্রধানত জলঙ্গী নদীর পাড়ের বিশেষ এঁটেল ও দোয়াঁশ মাটি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, যা এই পুতুলগুলির টেকসই এবং নমনীয়তার জন্য বিখ্যাত।

 * মাটি সংগ্রহ ও প্রস্তুতকরণ: নদী থেকে মাটি সংগ্রহ করে তা ভালোভাবে পরিষ্কার ও মন্ড তৈরি করা হয়।

 * আকৃতি দান: পুতুলগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাত দিয়েই তৈরি করা হয়, ছাঁচের ব্যবহার সীমিত। শিল্পীর হাতের সূক্ষ্ম কারুকার্য ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুতুলের আকার দেওয়া হয়।

 * শুকানো ও পোড়ানো: পুতুলটিকে প্রথমে রোদে শুকানো হয়।

 * রং করা: এরপর উজ্জ্বল ও জীবন্ত রং ব্যবহার করে পুতুলগুলিকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।

 * যা দেখবেন:

   * পুতুলপট্টি (Ghurni Putul Potti): এই অঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতেই মৃৎশিল্পের কাজ চলে। আপনি সরাসরি শিল্পীদের পুতুল তৈরি করতে দেখতে পাবেন এবং তাদের কাছ থেকে পুতুলের ইতিহাস ও তৈরির প্রক্রিয়া জানতে পারবেন।

   * পুতুল ও ভাস্কর্য: বিভিন্ন আকারের এবং বিষয়ের পুতুল দেখতে পাওয়া যায়—যেমন: লোকনৃত্য, বাউল, সবজি বিক্রেতা, পশুপাখি, দেবদেবীর মূর্তি এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য।

   * সংগ্রহ: পছন্দসই মাটির পুতুল আপনি সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকে বা স্থানীয় দোকান থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ

যদিও ঘূর্ণির মাটির পুতুলের বিশ্বজোড়া খ্যাতি রয়েছে, তবুও এই শিল্প বর্তমানে কিছু সমস্যার সম্মুখীন। নদীভাঙনের কারণে ভালো মানের মাটির সহজলভ্যতা কমেছে। এছাড়াও, নতুন প্রজন্ম কম পারিশ্রমিক ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

Google Maps

কিভাবে এখানে আসবেন

ঘূর্ণি এলাকাটি কৃষ্ণনগর শহরের পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত।

   * ট্রেনে: শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর সিটি জংশন পর্যন্ত লোকাল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে আসা যায়। স্টেশন থেকে রিকশা বা টোটো করে সহজেই ঘূর্ণি পুতুলপট্টিতে পৌঁছানো যায়।

   * সড়কপথে: কলকাতা থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ি করে কৃষ্ণনগর যাওয়া যায়।

Scroll to Top