পশ্চিম বর্ধমান জেলার পর্যটন কেন্দ্র গুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ

পশ্চিম বর্ধমান জেলা হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এটি মূলত শিল্প ও কয়লা প্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত এবং একে “ভারতের রূঢ়” (Ruhr of India) বলেও অভিহিত করা হয়।

গঠন: পূর্বতন বর্ধমান জেলাকে বিভক্ত করে ৭ এপ্রিল ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ২৩তম জেলা হিসেবে পশ্চিম বর্ধমান গঠিত হয়।

সদর দপ্তর: আসানসোল।

মহকুমা: এই জেলা দুটি মহকুমা নিয়ে গঠিত: আসানসোল সদর এবং দুর্গাপুর।

অর্থনীতি ও শিল্প: এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রধান শিল্পাঞ্চল। এই জেলার অর্থনীতিতে কয়লা খনি (বিশেষত রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র), ইস্পাত কারখানা (যেমন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট), তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অন্যান্য ভারী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল পূর্ব-উত্তর ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল।

ভূগোল: জেলার পশ্চিমাংশ ছোটনাগপুর মালভূমির বিস্তৃতি। এটি মূলত শিলা ও ল্যাটেরাইট মাটির অসমান ভূপ্রকৃতিযুক্ত। পূর্বাংশ ধীরে ধীরে কৃষিসমৃদ্ধ পূর্ব বর্ধমান জেলার সমতল ভূমির দিকে নেমে এসেছে।

পশ্চিম বর্ধমান জেলা মূলত তার শিল্প ও খনি অঞ্চলের জন্য পরিচিত হলেও, এখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার উল্লেখযোগ্য কিছু পর্যটন কেন্দ্রের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. মাইথন বাঁধ (Maithon Dam):

 * বিবরণ: এটি পশ্চিম বর্ধমান জেলার অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্র। এটি বরাকর নদের উপর নির্মিত একটি বিশাল বাঁধ এবং জলাধার।

 * বিশেষত্ব: জলাধারের চারপাশের মনোরম সবুজ প্রকৃতি এবং শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানে নৌকাবিহারের সুযোগ রয়েছে।

২. কল্যাণেশ্বরী মন্দির (Kalyaneshwari Temple):

 * বিবরণ: মাইথন বাঁধের কাছেই এই প্রাচীন কালী মন্দিরটি অবস্থিত। এটি একটি অত্যন্ত জাগ্রত শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত।

 * বিশেষত্ব: কিংবদন্তি অনুসারে, রাজা বল্লাল সেন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে এটি পশ্চিম বর্ধমানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান।

৩. গড় জঙ্গল:

 * বিবরণ: এটি দুর্গাপুরের কাছে কাঁকসা সিডি ব্লকে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান।

 * বিশেষত্ব: হিন্দু পুরাণ অনুসারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং এখানে মেধাস মুনির আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। বনভূমি এবং প্রাচীন ইতিহাসের কারণে এটি পরিচিত।

৪. ইছাই ঘোষের দেউল (Ichhai Ghosh’s Deul):

 * বিবরণ: এটি দুর্গাপুর মহকুমার অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। এটি একটি টাওয়ার মন্দির (রেখা-দেউল) হিসেবে পরিচিত।

 * বিশেষত্ব: এটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) দ্বারা তালিকাভুক্ত একটি জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভ, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করে।

৫. কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান – চুরুলিয়া:

 * বিবরণ: পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান এই জেলার জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রাম।

 * বিশেষত্ব: সাহিত্যপ্রেমী ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

৬. ঘাঘরবুড়ি চণ্ডী মন্দির:

 * বিবরণ: আসানসোল শহরের কাছে নুনীয়া নদীর তীরে এই প্রাচীন চণ্ডী মন্দিরটি অবস্থিত।

 * বিশেষত্ব: এটি এই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও জাগ্রত দেবী মন্দির। প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিন ঘাঘরবুড়ির পূজা উপলক্ষে বিরাট উৎসব হয়।

৭. আসানসোল শহর:

 * বিবরণ: এটি পশ্চিম বর্ধমান জেলার সদর শহর এবং রাজ্যের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও রেল কেন্দ্র।

 * বিশেষত্ব: শিল্পাঞ্চলের কর্মব্যস্ততা এবং রেলকেন্দ্রিক পুরনো শহরের মিশ্রণে এই শহরের অন্যরকম আকর্ষণ রয়েছে।

৮. দুর্গাপুর শহর:

 * বিবরণ: পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল, যা ‘রূঢ় অফ বেঙ্গল’ নামে পরিচিত।

 * বিশেষত্ব: প্রধানত ভারী শিল্প (লৌহ-ইস্পাত কারখানা, ইত্যাদি) এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনার জন্য পরিচিত।

এই জেলা প্রধানত শিল্পাঞ্চল হলেও, মাইথন এবং ঐতিহাসিক মন্দির ও স্থানগুলি পর্যটক

দের জন্য বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

Scroll to Top