সর্বমঙ্গলা মন্দির
🏰 সর্বমঙ্গলা মন্দির, বর্ধমান: এক ঐতিহাসিক তীর্থস্থান
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দেবী সর্বমঙ্গলা-এর মন্দিরটি রাঢ় বাংলার এক অত্যন্ত প্রাচীন ও পবিত্র তীর্থস্থান। এটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির হিসেবে পরিচিত। মন্দির ও দেবীমূর্তি উভয়ই স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
✨ মন্দিরের ইতিহাস ও কিংবদন্তি
* বিগ্রহের প্রাচীনত্ব: অনেকের মতে, মন্দিরে স্থাপিত দেবী সর্বমঙ্গলার মূর্তিটি প্রায় ১০০০ থেকে ২০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো।
* বিগ্রহ লাভ: প্রচলিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে বর্ধমান শহরের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে এই শিলামূর্তিটি পান। এটিকে চুনের ভাটিতে পোড়ানোর চেষ্টা হলেও মূর্তির কোনো ক্ষতি হয়নি। সেই রাতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে বর্ধমান মহারাজা সঙ্গম রায় মূর্তিটিকে নিয়ে এসে সর্বমঙ্গলা নামে পূজা শুরু করেন।
* মন্দির নির্মাণ: ১৭০২ (মতান্তরে ১৭৪০) সালে বর্ধমানের মহারাজাধিরাজ কীর্তিচাঁদ মহতাব বর্তমান নবরত্ন টেরাকোটার কারুকার্য খচিত মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
* শক্তিপীঠ: অনেকের বিশ্বাস, সর্বমঙ্গলা মন্দির হলো একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম, যেখানে দেবীর নাভি পড়েছিল।
* দেবীমূর্তি: দেবীর মূর্তিটি কষ্টিপাথরের তৈরি, অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী ‘মহিষমর্দিনী’ রূপিণী মহালক্ষী। মূর্তিটি আকারে প্রায় ১২ ইঞ্চি বাই ৮ ইঞ্চি।
🏛️ স্থাপত্য এবং অন্যান্য দেবালয়
* নবরত্ন মন্দির: মূল সর্বমঙ্গলা মন্দিরটি নবরত্ন শৈলীতে তৈরি, যার অর্থ এতে নয়টি চূড়া বা রত্ন রয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার (পোড়ামাটির) নিপুণ কারুকার্য লক্ষ্যণীয়।
* শিব মন্দির: মূল মন্দিরের আশেপাশে নাট মন্দির ছাড়াও একাধিক শিব মন্দির রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হলো— শ্বেত পাথরের তৈরি রামেশ্বর ও বাণেশ্বর এবং কালো পাথরের তৈরি মিত্রেশ্বর, চন্দ্রশ্বর ও ইন্দ্রেশ্বর নামে তিনটি শিব মন্দির।
* প্রবেশদ্বার: মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বারটি দক্ষিণে অবস্থিত, তবে পূর্বদিকে একটি পুরাতন প্রবেশদ্বারও আছে।
⏳ দর্শনের সময় ও পূজা
* সময়সূচী: প্রতিদিন সকালে ৬:০০টা থেকে দুপুর ১২:০০টা এবং সন্ধ্যায় ৪:০০টা থেকে রাত ৮:০০টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।
* নিত্য পূজা: এখানে নিত্য পূজার এক বিশেষ রীতি আছে। সকালে মন্দির খোলার পর দেবীকে মুখ ধুইয়ে সরবত খাওয়ানো হয়, এরপর মঙ্গলারতি হয়। তারপর চৌকিতে বসিয়ে তেল মাখিয়ে পঞ্চামৃত দিয়ে মহাস্নান করানো হয় এবং শাড়ী-গহনা পরিয়ে নিত্যপূজা চলে।
* বিশেষ উৎসব: শারদোৎসবের (দুর্গাপূজা) সময় এখানে দেবীর ঘট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। এছাড়া, কুমারী পূজা, পয়লা বৈশাখ, বিপত্তারিণী পূজা, কালী পূজা ও শিবরাত্রিতে প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়।
* ভোগ প্রসাদ: অনেক ভক্তই এখানে ভোগ প্রসাদের ব্যবস্থা করে থাকেন (প্রায় ৫০-৬০ টাকা কুপন মূল্য)। আগে থেকে কুপন কেটে রাখতে হয়।
📝 ভ্রমণ টিপস
* পোশাক: মন্দির যেহেতু একটি ধর্মীয় স্থান, তাই শালীন পোশাক পরা বাঞ্ছনীয়।
* ভিড় এড়িয়ে চলুন: উৎসবের দিনগুলিতে এবং ছুটির দিনে প্রচুর ভিড় হয়। ভিড় এড়াতে চাইলে সপ্তাহের অন্যান্য দিন সকালে যাওয়া ভালো।
* আবাসন: বাইরের তীর্থযাত্রীদের জন্য মন্দিরের কাছে যাত্রী নিবাসের ব্যবস্থা আছে (ভাড়া প্রায় ৫০০-৭০০ টাকা)।
* অন্যান্য স্থান: সর্বমঙ্গলা মন্দির দর্শনের পাশাপাশি বর্ধমানের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান যেমন— কার্জন গেট, ১০০৮ শিব মন্দির, গোলবাগ এবং কঙ্কালেশ্বরী কালীবাড়িও ঘুরে আসতে পারেন।
Google Maps
কিভাবে এখানে আসবেন
* ট্রেনে: বর্ধমান জংশন একটি প্রধান রেলওয়ে স্টেশন, যা হাওড়া ও শিয়ালদহ থেকে খুব ভালোভাবে সংযুক্ত।
* সড়ক পথে: কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ২ (NH2/দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে) ধরে বর্ধমানে পৌঁছানো যায় (দূরত্ব প্রায় ১০০ কিমি)।
* স্থানীয় পরিবহন: বর্ধমান স্টেশন থেকে মন্দির পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র ৩ কিমি। স্টেশন থেকে খুব সহজে টোটো বা রিকশা করে সরাসরি মন্দিরে পৌঁছানো যায় (ভাড়া প্রায় ২০ টাকা)।
