শের আফগানের সমাধি

বর্ধমানের বুকে লুকিয়ে থাকা মুঘল আমলের এক করুণ প্রেমের গল্পের সাক্ষী এই সমাধি। শের আফগান (আলি কুলি খাঁ ইস্তাজলু) ছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রথম স্ত্রী, পরবর্তীকালের সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের (মেহেরুন্নিসা) প্রথম স্বামী এবং বর্ধমানের জায়গিরদার।

১. 🗺️ অবস্থান এবং পৌঁছানোর উপায়

 * ঠিকানা: আলমগঞ্জ এলাকা, বর্ধমান শহর, পূর্ব বর্ধমান জেলা, পশ্চিমবঙ্গ।

 * নিকটতম স্থান: বর্ধমান রাজবাড়ী (রাজবাটীর উত্তর ফটক থেকে কিছুটা এগিয়ে)। এটি বর্ধমান কার্জন গেট (বিজয় তোরণ) থেকে বি.সি রোড ধরে সামান্য দূরে অবস্থিত।

২. 📜 ঐতিহাসিক পটভূমি

শের আফগানের সমাধিটি মূলত একটি ট্র্যাজেডির প্রতীক, যা ইতিহাসের পাতায় খুব গুরুত্বপূর্ণ:

 * শের আফগান কে ছিলেন? আসল নাম আলি কুলি খাঁ ইস্তাজলু। পারস্যে জন্ম। তিনি মুঘল সেনায় যোগ দেন এবং একবার বাঘের আক্রমণ থেকে যুবরাজ সেলিমকে (পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীর) বাঁচিয়ে ‘শের আফগান’ উপাধি পান।

 * নূরজাহান সংযোগ: ১৫৯৪ সালে তিনি আকবরের তত্ত্বাবধানে মেহেরুন্নিসাকে বিবাহ করেন। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর (সেলিম) মেহেরুন্নিসার রূপে মুগ্ধ ছিলেন বলে কথিত আছে।

 * মৃত্যু: ১৬০৭ সালে জাহাঙ্গীর শের আফগানের বিরুদ্ধে কর ফাঁকি ও বিদ্রোহের অভিযোগ আনেন। বাংলার সুবেদার কুতুবউদ্দিন খান কোকা বর্ধমানে এসে শের আফগানকে বন্দী করার চেষ্টা করেন। এই দ্বন্দ্বে শের আফগান কুতুবউদ্দিনকে মারাত্মকভাবে জখম করেন এবং কুতুবউদ্দিনের অনুচরদের হাতে শের আফগান নিহত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই কুতুবউদ্দিনও মারা যান।

 * পরিণতি: শের আফগানের মৃত্যুর পর মেহেরুন্নিসাকে দিল্লিতে পাঠানো হয় এবং চার বছর পর তিনি জাহাঙ্গীরকে বিবাহ করে নূরজাহান উপাধি পান।

 * সমাধি: শের আফগান এবং কুতুবউদ্দিন খান কোকা – উভয়ের সমাধি পাশাপাশি একই চত্বরে রয়েছে।

৩. 🏛️ সমাধির স্থাপত্য ও চত্বর

 * সমাধি চত্বর: এটি এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) দ্বারা সুরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক স্থান।

 * শের আফগান ও কুতুবউদ্দিনের সমাধি: দুটি সমাধি পাশাপাশি রয়েছে। এগুলির ওপর বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুতে উৎকীর্ণ শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। সমাধি দুটি একটি ছোট কাঠামোর নিচে অবস্থিত, যার চার কোণে চারটি কলস রয়েছে।

 * পীর বাহরামের সমাধি: এই চত্বরেই তুর্কি বংশোদ্ভূত সুফি সাধক পীর বাহরাম সাক্কার বিশাল সমাধি রয়েছে। তিনি ছিলেন জলের পরিবেশক বা ‘সাক্কা’।

 * মসজিদ: চত্বরে একটি মসজিদও রয়েছে।

 * স্থাপত্য: যদিও সমাধির মূল কাঠামো খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়, তবে পীর বাহরামের বর্গাকার সমাধিটিতে আঠালো মিনার এবং ফুল ও জ্যামিতিক নকশার পোড়ামাটির কারুকার্য চোখে পড়ে।

৪. 📝 ভ্রমণ টিপস

 * সময়: সাধারণত দিনের বেলায় এটি খোলা থাকে। সকালে বা বিকেলে পরিদর্শন করা ভালো।

 * প্রবেশমূল্য: এটি ASI দ্বারা সংরক্ষিত হওয়ায় সাধারণত একটি নামমাত্র প্রবেশমূল্য থাকতে পারে, তবে এটি যাচাই করে নেওয়া দরকার।

 * আশেপাশের দ্রষ্টব্য স্থান: বর্ধমান শহরে এলে আপনি সহজেই দেখতে পারেন:

   * কার্জন গেট (বিজয় তোরণ)

   * ১০৮ শিব মন্দির

   * সর্বমঙ্গলা মন্দির

   * গোলবাগ (ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আদলে তৈরি)

উপসংহার: শের আফগানের সমাধি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, এটি মুঘল আমলের প্রেম, ক্ষমতা ও বিশ্বাসঘাতকতার এক নীরব দলিল। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি একটি আবশ্যক গন্তব্য।

Google Maps

কিভাবে এখানে আসবেন

 * রেলপথে: নিকটতম প্রধান স্টেশন হলো বর্ধমান জংশন (BWN), যা কলকাতা (হাওড়া/শিয়ালদহ) থেকে নিয়মিত ট্রেন মারফত সংযুক্ত।

 * সড়কপথে: জাতীয় সড়ক ১৯ (NH 19) ও জিটি রোড ধরে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে বর্ধমান শহরে পৌঁছানো যায়।

 * স্থানীয় পরিবহন: স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ড থেকে আলমগঞ্জ এলাকার দিকে যাওয়ার জন্য অটো রিকশা বা টোটো ভাড়া করতে হবে।

 * গন্তব্য: এটি বর্ধমান রাজবাড়ীর কাছাকাছি পীর বাহরাম সাক্কার দরগা চত্বরে অবস্থিত।

Scroll to Top