বকখালি
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় অবস্থিত বকখালি হলো সপ্তাহান্তের ছুটির জন্য একটি অন্যতম শান্ত ও মনোরম পর্যটন কেন্দ্র। কলকাতার কাছেই বঙ্গোপসাগরের তটে এই সমুদ্র সৈকতটি তার নির্জনতা এবং লাল কাঁকড়ার জন্য পরিচিত।
১. দর্শনীয় স্থানসমূহ
বকখালিতে দেখার মতো বেশ কিছু সুন্দর জায়গা রয়েছে:
* বকখালি সমুদ্র সৈকত: এটি একটি অত্যন্ত শান্ত ও মনোরম সমুদ্র সৈকত, এখানকার সমুদ্রতট বেশ বিস্তৃত এবং জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে এই সৈকত রূপ পরিবর্তন করে। সৈকতের পাশে ঝাউবনের সারি এবং লাল কাঁকড়াদের অবাধ বিচরণ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্র।
* হেনরি আইল্যান্ড (Henry Island): বকখালি থেকে মাত্র ৪ কিমি দূরে অবস্থিত হেনরি আইল্যান্ড একটি শান্ত ও মনোরম পর্যটন কেন্দ্র, যা তার নির্জন সমুদ্র সৈকতের জন্য পরিচিত। এখানকার ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং লাল কাঁকড়ার বিচরণ পর্যটকদের এক অনন্য প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দেয়। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপটি নিরিবিলি পরিবেশে ছুটি কাটানোর জন্য একটি আদর্শ জায়গা।
* ফ্রেজার সাহেবের বাড়ি: সমুদ্র সৈকতের কাছে অবস্থিত এই বাড়িটি “হাউস অফ লর্ড ফ্রেজার” (House of Lord Fraser) নামেও পরিচিত। স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন। তিনি বকখালি এবং ফ্রেজারগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এই বাংলোটি নির্মাণ করেছিলেন।
ফ্রেজারগঞ্জ এলাকাটির নামকরণও করা হয়েছে তাঁর নামানুসারে। তবে বর্তমানে বাংলোটির খুব সামান্য অংশই এখন টিকে আছে। সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় এটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে অনেক পর্যটক এখানে ভিড় করেন। এখানে বড় বড় বায়ুকল (Windmills) দেখতে পাওয়া যায়।
ফ্রেজারগঞ্জ ফিশিং হারবার: এখানে শত শত মাছ ধরার ট্রলার দেখা যায়। জেলেরা গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরে আনার পর এখানে পাইকারি দরে মাছ বিক্রি বা নিলাম করা হয়। আপনি যদি খুব সকালে এখানে পৌঁছাতে পারেন, তবে মাছের নিলামের এক দারুণ দৃশ্য দেখতে পাবেন।
* জম্বু দ্বীপ (Jambu Dwip): বকখালির কাছে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত জম্বু দ্বীপ একটি জনমানবহীন ও সংরক্ষিত সুন্দর দ্বীপ। এই দ্বীপটি মূলত তার আদিম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সাধারণ পর্যটকদের দ্বীপে নামার অনুমতি নেই, তবে ট্রলার বা নৌকায় চড়ে দূর থেকে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
* বনবিবি মন্দির ও কুমির প্রকল্প: বকখালি বাস স্ট্যান্ডের কাছেই একটি ছোট কুমির প্রজনন কেন্দ্র এবং হরিণ উদ্যান রয়েছে।
২.থাকার ব্যবস্থা
বকখালিতে থাকার জন্য অনেক অপশন আছে:
* WBTDCL (বকখালি টুরিস্ট লজ): এটি সরকারি আবাসন এবং সমুদ্রের খুব কাছে। আগে থেকে বুকিং করা ভালো।
* বেসরকারি হোটেল: বকখালি বাজার এবং সমুদ্রের ধারে প্রচুর বেসরকারি হোটেল ও রিসর্ট পাওয়া যায় (ভাড়া ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে)।
* বেনফিশ (Benfish): হেনরি আইল্যান্ডে থাকার জন্য বেনফিশের কটেজগুলো খুব জনপ্রিয়।
৩. খাওয়া-দাওয়া
বকখালি মূলত ভোজনরসিকদের জন্য স্বর্গ, বিশেষ করে যারা মাছ পছন্দ করেন।
* টাটকা ইলিশ, পাবদা, পমফ্রেট এবং বাগদা চিংড়ি এখানে সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়।
* সৈকতের ধারের ছোট দোকানগুলোতে ভাজা মাছ (Fish Fry) অবশ্যই ট্রাই করবেন।
৪. ভ্রমণের সেরা সময়
* অক্টোবর থেকে মার্চ: বকখালি ঘোরার সেরা সময়। আবহাওয়া মনোরম থাকে।
* বর্ষাকাল: যারা ইলিশ উৎসব বা সমুদ্রের উত্তাল রূপ দেখতে চান, তারা জুলাই-আগস্টে যেতে পারেন।
কিছু জরুরি টিপস:
* সৈকতে ঘোরাঘুরির জন্য টোটো ভাড়া করে নিতে পারেন (পুরো বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ ঘুরিয়ে দেখাবে)।
* হেনরি আইল্যান্ড যাওয়ার জন্য সকালের সময়টি বেছে নিন।
* সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার সময় আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
কিভাবে এখানে আসবেন
কলকাতা থেকে বকখালির দূরত্ব প্রায় ১২৫ কিমি।
* ট্রেনে: শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে নামখানা লোকাল ধরুন। নামখানা স্টেশনে নেমে টোটো বা অটো করে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে বাসে বা ম্যাটাডোরে বকখালি (প্রায় ৪৫ মিনিট)।
* বাসে: ধর্মতলা (এসপ্ল্যানেড) থেকে সরাসরি বকখালির সরকারি (SBSTC) বা বেসরকারি বাস ছাড়ে। সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা।
* গাড়িতে: ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে সরাসরি বকখালি পৌঁছানো যায়। রাস্তা এখন বেশ উন্নত।
