গঙ্গাসাগর
গঙ্গাসাগর মেলা এবং এই তীর্থস্থানটি ভ্রমণ করা লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে একটি পরম আকাঙ্ক্ষার বিষয়। বিশেষ করে মকর সংক্রান্তির সময় এর মাহাত্ম্য বহুগুণ বেড়ে যায়।
১. প্রধান দর্শনীয় স্থান
গঙ্গাসাগরে মূল আকর্ষণ হলো গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে পুণ্যস্নান। তবে এছাড়াও দেখার মতো রয়েছে:
* কপিল মুনির মন্দির: মন্দিরটির ঐতিহাসিক, ধর্মীয় এবং পৌরাণিক গুরুত্ব অপরিসীম। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এই মন্দিরটি ভগবান বিষ্ণুর অবতার কপিল মুনির স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয়েছে। কথিত আছে ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা সগর অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেছিলেন। ইন্দ্র সেই যজ্ঞের ঘোড়াটি চুরি করে কপিল মুনির আশ্রমের পিছনে লুকিয়ে রাখেন। রাজা সগরের ৬০ হাজার পুত্র ঘোড়াটি খুঁজতে এসে কপিল মুনিকে চোর ভেবে অপমান করেন। এতে রুষ্ট হয়ে মুনি তাদের ভস্মীভূত করে দেন। পরবর্তীতে রাজা সগরের উত্তরসূরি ভগীরথ গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নিয়ে আসেন। যেখানে গঙ্গা ও সাগরের মিলন হয়েছে, সেখানেই সেই ৬০ হাজার পুত্রের আত্মা মুক্তি লাভ করেছিল। এই স্থানটিই বর্তমানে কপিল মুনির মন্দির এলাকা।
মন্দিরের গঠন ও বিগ্রহ:
বর্তমান মন্দিরটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। আগের অনেক মন্দির সমুদ্রের ঢেউয়ে তলিয়ে যাওয়ার পর ১৯৬১ সালে বর্তমান মন্দিরটি নতুন করে তৈরি করা হয়।
মন্দিরের ভেতরে পাথরের বিগ্রহের বদলে সাদা মার্বেল পাথরের কপিল মুনির মূর্তি রয়েছে। মুনির বাম হাতে একটি কমণ্ডলু এবং ডান হাত বরাভয় মুদ্রায় থাকে। মূর্তির দুপাশে রাজা সগর এবং গঙ্গার ছোট ছোট মূর্তি লক্ষ্য করা যায়।
মকর সংক্রান্তি ও মাহাত্ম্য:
প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির সময় (জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি) এখানে বিশাল মেলা বসে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস যে, গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে স্নান করে কপিল মুনির মন্দিরে পুজো দিলে জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। প্রচলিত প্রবাদ আছে— “সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার।”
ভৌগোলিক অবস্থান:
এই মন্দিরটি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সাগর দ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এটি সরাসরি বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে সমুদ্রের বিশালতা খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়।
মন্দিরের দর্শনের নিয়মাবলী:
মন্দিরটি সাধারণত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
দর্শনার্থীরা সাধারণত প্রথমে সাগর সঙ্গমে স্নান করেন এবং তারপর ভিজা পোশাকে বা শুদ্ধ কাপড়ে কপিল মুনির মন্দিরে পুজো দিতে যান। মন্দিরের ভেতরে ফল, মিষ্টি ও ধূপকাঠি দিয়ে পুজো দেওয়া যায়। কপিল মুনিকে সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা হিসেবেও গণ্য করা হয়, তাই আধ্যাত্মিক এবং জ্ঞানান্বেষী মানুষের কাছেও এই মন্দিরের গুরুত্ব অনেক।
* সাগর তট: মাইলের পর মাইল বিস্তৃত শান্ত সমুদ্র সৈকত। সূর্যাস্তের দৃশ্য এখান থেকে অপূর্ব লাগে।
* অন্যান্য মন্দির: ভারত সেবাশ্রম সংঘ, ওঙ্কারনাথ মন্দির এবং রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম।
২. ভ্রমণের সেরা সময়
* মকর সংক্রান্তি (জানুয়ারি মাস): এই সময় বিশাল মেলা বসে। তবে ভিড় এড়িয়ে শান্তিতে ঘুরতে চাইলে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে যাওয়া সবচেয়ে ভালো।
* মনে রাখবেন: গ্রীষ্মকালে এখানে প্রচণ্ড গরম থাকে, তাই শীতকালই ভ্রমণের আদর্শ সময়।
৩. থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
* সাগরতটের কাছেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্যুরিস্ট লজ এবং বিভিন্ন ট্রাস্টের ধরমশালা আছে।
* ভারত সেবাশ্রম সংঘ এবং লোকনাথ মন্দিরেও থাকার সুব্যবস্থা থাকে (আগে থেকে বুকিং করা ভালো)।
* খাওয়ার জন্য স্থানীয় ছোট ছোট অনেক হোটেল ও আশ্রমের ভোজনালয় রয়েছে।
৪. জরুরি টিপস
* জোয়ার-ভাটার সময়: ভেসেল চলাচলের সময় সম্পূর্ণ নির্ভর করে মুড়িগঙ্গা নদীর জোয়ার-ভাটার ওপর। তাই যাওয়ার আগে ভেসেলের সময়সূচী জেনে নেওয়া জরুরি।
* পোশাক: শীতকালে গেলে অবশ্যই গরম কাপড় সাথে রাখবেন কারণ সমুদ্রের হাওয়ায় রাতে বেশ ঠান্ডা লাগে।
* পরিচ্ছন্নতা: তীর্থস্থান পরিষ্কার রাখতে প্লাস্টিক ব্যবহার বর্জন করুন।
কিভাবে এখানে আসবেন
কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর যাওয়ার প্রধান পথ হলো শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা হয়ে অথবা সড়কপথে বাবুঘাট থেকে।
* ট্রেনে: শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে ‘নামখানা’ বা ‘কাকদ্বীপ’ গামী লোকালে উঠতে হবে। কাকদ্বীপ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে অটো বা টোটোতে করে যেতে হবে লট নম্বর ৮ (Lot No. 8) জেটি ঘাটে।
* বাসে: ধর্মতলা (বাবুঘাট) থেকে সরাসরি কাকদ্বীপ বা লট নম্বর ৮ যাওয়ার বাস পাওয়া যায়।
* জলপথ: লট নম্বর ৮ থেকে ভেসেল বা লঞ্চে করে মুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে ওপারে কচুবেরিয়া ঘাটে পৌঁছাতে হবে।
* কচুবেরিয়া থেকে সাগরতট: কচুবেরিয়া ঘাটে নামার পর সেখান থেকে বাস বা প্রাইভেট ট্যাক্সিতে করে প্রায় ৩০ কিমি দূরে মূল মন্দির বা সাগরতটে পৌঁছাতে হয়।
