ইছাই ঘোষের দেউল

ইছাই ঘোষের দেউল একটি ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি এবং এটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পশ্চিম বর্ধমান জেলার একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

অবস্থান:

 * ইছাই ঘোষের দেউল পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার গৌরাঙ্গপুর গ্রামের কাছে অজয় নদের তীরে অবস্থিত।

 * এটি বর্তমানে একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট এবং পর্যটন কেন্দ্র, যা দেউল পার্ক (Deul Park)-এর অংশ হিসেবে পরিচিত।

ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব:

 * স্থাপত্যশৈলী: এই দেউলটি বাংলায় বিরল রেখ-দেউল স্থাপত্যশৈলীর একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে ওড়িশার স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

 * গঠন: এটি পোড়ামাটির ইঁটে তৈরি একটি উঁচু মন্দির, যার শিখরটি প্রায় ১৮ মিটার (প্রায় ৬০ ফুট) উঁচু। এটি একটি বর্গাকার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

 * গর্ভগৃহ: মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি জানালাবিহীন গর্ভগৃহ রয়েছে, যেখানে বর্তমানে একটি কালো পাথরের শিবলিঙ্গ পূজিত হয়। তবে অনেকের মতে, প্রথমদিকে এটিতে কোনো বিগ্রহ ছিল না।

 * ইতিহাস ও কিংবদন্তী:

   * এই দেউলটি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ধর্মমঙ্গল কাব্য-এর নায়ক ইছাই ঘোষ (ঈশান ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষ)-এর স্মৃতি বহন করে। কিংবদন্তী অনুসারে, ইছাই ঘোষ তার বিজয়ের স্মারক হিসেবে এটি নির্মাণ করেছিলেন।

   * তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন মন্দিরটি ১৬শ-১৭শ শতাব্দীর বেশি পুরোনো নয়, যদিও কিছু মতানুসারে এটি ১১শ শতাব্দীর আশেপাশেও হতে পারে। এটি বর্তমানে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (ASI) কর্তৃক সংরক্ষিত একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ।

কোথায় থাকবেন ও কী দেখবেন:

 * আবাসন: দেউল পার্কের নিজস্ব কটেজ ও গেস্ট হাউস রয়েছে (দেউল ইকো রিসর্ট), যেখানে এসি ও নন-এসি উভয় ধরনের ঘর পাওয়া যায়। এখানে থাকার ও খাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া দুর্গাপুর শহরেও থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

 * আশেপাশের দ্রষ্টব্য স্থান:

   * দেউল পার্ক: দেউলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পার্কে মনোরম পরিবেশ, সবুজ বাগান, এবং অজয় নদের তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। শীতকালে এখানে বহু মানুষ পিকনিক করতে আসেন।

   * শ্যামরূপা মন্দির (শ্যামারূপা মন্দির): ইছাই ঘোষের উপাস্য দেবী চণ্ডীর রূপ। এটি দেউলের কাছেই অবস্থিত এবং দুর্গাপূজার সময় এখানে ভিড় হয়।

   * গড় জঙ্গল (Garh Jungle): দেউলের কাছেই ঘন বনভূমি রয়েছে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে।

   * কালিকাপুরের জোড়া শিবমন্দির: কাছেই অবস্থিত এই মন্দিরটিও দেখা যেতে পারে।

   * সময় থাকলে কাছাকাছি জয়দেব কেঁদুলি, ভল্কি মাচান বা দামোদর ব্যারেজও ঘুরে আসা যায়।

ভ্রমণের সেরা সময়:

 * ইছাই ঘোষের দেউল পরিদর্শনের জন্য শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) হলো সবচেয়ে ভালো সময়। এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং পিকনিকের ভিড়ও থাকে। বর্ষাকাল সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

কিছু টিপস:

 * বর্তমানে এই অঞ্চলে থার্মোকল ও প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং উচ্চস্বরে বক্স বাজানো নিষিদ্ধ। পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সাহায্য করা উচিত।

 * ইতিহাস ও স্থাপত্য ভালোবাসলে এই দেউল এবং এর আশেপাশের স্থানগুলি অবশ্যই আপনার ভালো লাগবে। অজয় নদের ধারে সূর্যাস্তের দৃশ্য খুবই মনোরম।

Google Maps

কিভাবে এখানে আসবেন

 * সড়কপথে:

   * কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পানাগড় (Panagarh) হয়ে যাওয়া যায়। পানাগড়ের দার্জিলিং মোড় থেকে ডান দিকে বাঁক নিয়ে এগারো মাইল মোড় হয়ে যেতে পারেন। দেউল পার্ক পানাগড় স্টেশন থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে।

   * দুর্গাপুর থেকেও সড়কপথে যাওয়া যায়।

   * গৌরাঙ্গপুরে পৌঁছানোর জন্য বাস বা নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে।

 * রেলপথে:

   * নিকটতম প্রধান রেল স্টেশন হলো দুর্গাপুর (Durgapur)।

   * দুর্গাপুর স্টেশন থেকে মিনিবাসে মুচিপাড়া বা অন্য স্থানীয় স্টপেজে নেমে সেখান থেকে অটো বা ট্রেকারে দেউল পার্কে পৌঁছানো যায়।

Scroll to Top