জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
🏛️ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি:
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকায় অবস্থিত ঠাকুর পরিবারের প্রাচীন বাড়ি। এই বাড়িতেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর জীবনের অনেকটা সময় কাটান। বর্তমানে এটি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষাপ্রাঙ্গণ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর (রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়াম)।
📜 ইতিহাস ও তাৎপর্য
* প্রতিষ্ঠা: ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রপিতামহ নীলমণি ঠাকুর এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।
* নবজাগরণের পীঠস্থান: উনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণ বা বেঙ্গল রেনেসাঁস-এর অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই বাড়ি।
* রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও মহাপ্রয়াণ: ১৮৬১ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ) তিনি এখানেই তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
🧭 দর্শনীয় স্থান এবং কক্ষসমূহ
ঠাকুরবাড়ি এখন একটি সুসংরক্ষিত জাদুঘর, যা চারটি ভবন এবং প্রায় ১৮টি গ্যালারি নিয়ে গঠিত।
১. প্রধান ভবন (মহর্ষি ভবন)
* রবীন্দ্র প্রয়াণকক্ষ: দোতলার এই ঘরেই কবিগুরু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। এটি প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম।
* কবির আঁতুড় ঘর: যে ঘরে রবীন্দ্রনাথ ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, সেটিও এখানে সযত্নে সংরক্ষিত।
* বংশপঞ্জি কক্ষ: এখানে ঠাকুর পরিবারের বংশপঞ্জি, বিভিন্ন সদস্যের তৈলচিত্র এবং কিছু বইয়ের প্রথম সংস্করণ দেখতে পাবেন।
* খাবার ঘর ও হেঁসেল: দোতলায় কবির খাবার ঘর এবং তার লাগোয়া মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘর (হেঁসেল) আছে।
* সংগীতের ঘর: যেখানে সংগীত চর্চা হতো।
* নোবেল পুরস্কার গ্যালারি: এখানে গীতাঞ্জলি ও নোবেল পুরস্কার সম্পর্কিত তথ্য, নাইটহুড বর্জনের কারণ বর্ণনা করে ইংরেজ সরকারকে লেখা পত্রের কপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী রয়েছে।
* শিল্প গ্যালারি: এখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধারার শিল্পকর্ম, যেমন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, নন্দলাল বসু-সহ অন্যান্য শিল্পীদের আঁকা ছবি সংরক্ষিত আছে।
* অন্যান্য কক্ষ: দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন জিনিসপত্রও এখানে সংরক্ষিত আছে।
২. বিচিত্রা ভবন
* ভিক্টোরিয়া হল: দোতলায় এই হলঘরে শিলাইদহ কুঠিবাড়ির কিছু ছবি এবং রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত বোটে করে পদ্মায় ভ্রমণের প্রতিকৃতি (বাংলাদেশ সরকারের উপহার) রয়েছে।
* উঠোন ও মঞ্চ: উঠোনের এক দিকে স্থায়ী মঞ্চ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়।
৩. বাইরের দিকের ভবন
* কবির ব্যবহৃত গাড়ি: এখানে একটি একচালা গ্যারেজে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত একটি গাড়ি রাখা আছে।
৪. উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ
* বর্তমানে এটি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাঙ্গণ। এখানে বহু ছাত্রছাত্রীর আনাগোনা থাকে।
* প্রতি বছর এখানে ঘটা করে বর্ষবরণ, পঁচিশে বৈশাখ (রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী) এবং বাইশে শ্রাবণ (কবির প্রয়াণ দিবস) পালিত হয়।
🕒 সময়সূচী ও প্রবেশমূল্য
* সময়:
* সোম থেকে শুক্রবার: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
* শনিবার: সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত।
* সাপ্তাহিক বন্ধ: রবিবার এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে।
* প্রবেশমূল্য: সাধারণত ২০ টাকা (পরিবর্তন সাপেক্ষ)।
⚠️ কিছু সতর্কতা
* টিকিট: ভ্রমণের জন্য কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিতে হবে।
* ছবি তোলা: জাদুঘরের অভ্যন্তরে বিশেষ বিশেষ জায়গা ছাড়া ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ছবি তোলার অনুমতি নিতে চাইলে অতিরিক্ত ফি (সাধারণত ৫০ টাকা, পরিবর্তন সাপেক্ষ) জমা দিতে হয়।
* পরিবেশ: ভিতরে উচ্চস্বরে কথা বলা বা চেঁচামেচি করা এবং পরিবেশ নোংরা করা বারণ।
কিভাবে এখানে আসবেন
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি কলকাতার একটি অত্যন্ত পরিচিত স্থান। শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজে এখানে পৌঁছানো যায়:
* মেট্রো: নিকটতম মেট্রো স্টেশন হলো গিরিশ পার্ক (Girish Park)। স্টেশন থেকে হেঁটে বা অটো রিকশায় সহজেই ঠাকুরবাড়ি যাওয়া যায়।
* বাস/ট্যাক্সি: কলকাতার যেকোনো স্থান থেকে জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়গামী বাস বা ট্যাক্সি পাওয়া যায়।
