কালনা রাজবাড়ি
কালনা শহরটি ‘মন্দিরের শহর’ (City of Temples) নামে পরিচিত এবং ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। এখানকার রাজবাড়ি কমপ্লেক্সটি বিশেষ করে বর্ধমানের মহারাজা দ্বারা ১৮শ শতাব্দীতে নির্মিত বহু পোড়ামাটির (terracotta) মন্দিরের জন্য বিখ্যাত।
🏛️ প্রধান আকর্ষণ: কালনা রাজবাড়ি কমপ্লেক্স (Kalna Rajbari Complex)
কালনা রাজবাড়ির ভেতরের পুরোনো প্রাসাদটির এখন খুব বেশি অংশ অবশিষ্ট নেই, কিন্তু রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত মন্দিরগুলি স্থাপত্য ও শিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন। এখানকার প্রধান মন্দিরগুলি হলো:
১। ১০৮ শিব মন্দির (108 Shiva Temples): এটি কালনার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থান । দেখতে অনেকটা জপমালার (Rudraksha Mala) মতো।
মন্দিরের ইতিহাস ও স্থাপত্য
প্রতিষ্ঠাতা: মহারাজা তেজ চন্দ্র বাহাদুর।
প্রতিষ্ঠা কাল: ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
প্রেক্ষাপট: কথিত আছে, রাজা তিলকচাঁদের বিধবা স্ত্রী রানি বিষ্ণুকুমারী স্বপ্নে এই মন্দির নির্মাণের নির্দেশ পান। মহারাজা তেজ চন্দ্র বাহাদুর তাঁর রাজত্বের ক্ষমতা হস্তান্তরের স্মৃতিচারণ করতে মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
নামকরণ: হিন্দু পুরাণে ১০৮ সংখ্যাটিকে একটি পবিত্র সংখ্যা মনে করা হয়, যা জপমালার ১০৮টি পুঁতিকে নির্দেশ করে। এই কারণে মন্দিরের মোট সংখ্যা ১০৮টি।
গঠনশৈলী: মন্দিরটি একটি কূপকে কেন্দ্র করে দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তে নির্মিত।
বাইরের বৃত্ত: এখানে রয়েছে ৭৪টি মন্দির। এই মন্দিরগুলিতে পর্যায়ক্রমে সাদা মার্বেল ও কালো পাথরের শিবলিঙ্গ রয়েছে। কালো শিবলিঙ্গগুলি শিবের রুদ্র বা ক্রুদ্ধ রূপের প্রতীক এবং সাদা শিবলিঙ্গগুলি শিবের শান্ত ও সৌম্য রূপের প্রতীক।
ভিতরের বৃত্ত: এখানে রয়েছে ৩৪টি মন্দির। এই মন্দিরগুলিতে সবগুলিই সাদা মার্বেলের শিবলিঙ্গ।
বিশেষত্ব: এর স্থাপত্যশৈলী এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে মন্দিরের ঠিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে দাঁড়িয়ে সবগুলি ১০৮টি শিবলিঙ্গ দর্শন করা যায়। এই কারণে এটি স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন।
২। প্রতাপেশ্বর মন্দির (Pratapeswar Temple): এটি রাজবাড়ি চত্বরের সবচেয়ে সুন্দর মন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এটি একটি একরত্ন শৈলীর (Eka-Ratna style) মন্দির, যার দেওয়াল জুড়ে অপূর্ব পোড়ামাটির কাজ দেখতে পাওয়া যায়।
৩। লালজি মন্দির (Lalji Temple): এই মন্দিরটি ২৫টি চূড়া (Pancha-Bimsati Ratna) যুক্ত এবং এর দেওয়ালগুলিও টেরাকোটার কাজে সুসজ্জিত। এর পাশে একটি রাস মঞ্চ (Ras Mancha) রয়েছে।
৪। কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির (Krishna Chandra Temple): এটিও ২৫ রত্ন শৈলীর (Pancha-Bimsati Ratna style) মন্দির, যা অসাধারণ পোড়ামাটির ভাস্কর্য দ্বারা অলঙ্কৃত।
৫। সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির (Siddheswari Kali Temple): এটি একটি প্রাচীন ও পবিত্র মন্দির।
⏳ সময় এবং খরচ (Time & Expense)
সময়: কালনা সাধারণত কলকাতা থেকে একদিনের ভ্রমণের (One-Day Trip) জন্য আদর্শ। সকাল সকাল রওনা হলে সন্ধ্যায় ফিরে আসা সম্ভব।
সময়সূচী: রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের মন্দিরগুলি সাধারণত সকাল ৬টা/৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা/৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
প্রবেশ মূল্য: রাজবাড়ি চত্বরে প্রবেশ করতে একটি সামান্য টিকিট মূল্য (সাধারণত ১০-২০ টাকা) লাগে।
🌟 ভ্রমণের টিপস (Travel Tips)
দিনের বেলায় রাজবাড়ি চত্বর ও মন্দিরগুলি ভালো করে ঘুরে দেখার জন্য সকাল সকাল পৌঁছানো উচিত।
গরমে গেলে জল ও ছাতা অবশ্যই রাখুন।
পুরো কমপ্লেক্স হেঁটে ঘুরতে হয়, তাই আরামদায়ক জুতো পরা ভালো।
মন্দির এবং পোড়ামাটির কাজ সংরক্ষণের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
কালনা রাজবাড়ি কমপ্লেক্স বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং অসাধারণ স্থাপত্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। এটি ইতিহাস প্রেমী এবং ভ্রমণ পিপাসু মানুষের জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
Google Maps
কিভাবে এখানে আসবেন
রেলপথে (By Train):
হাওড়া (Howrah) বা শিয়ালদহ (Sealdah) স্টেশন থেকে কাটোয়া (Katwa) গামী লোকালে উঠে অম্বিকা কালনা (Ambika Kalna) স্টেশনে নামুন।
স্টেশন থেকে রাজবাড়ি কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর জন্য টোটো বা অটো পাওয়া যায় (প্রায় ৫-১০ মিনিটের পথ)।
সড়কপথে (By Road):
কলকাতা থেকে কালনার দূরত্ব প্রায় ৯০-১০০ কিলোমিটার।
কলকাতা থেকে গাড়িতে গেলে সাধারণত ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে।
জলপথে (By Water):
শান্তিপুর (Shantipur) থেকে ফেরি পার হয়েও কালনা ঘাটে পৌঁছানো যায়।
