মায়াপুর ইসকন মন্দির
মায়াপুর: এক বৈষ্ণব তীর্থভূমি
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় ভাগীরথী (গঙ্গা) ও জলঙ্গী নদীর মিলনস্থলের কাছে অবস্থিত শ্রীমায়াপুর একটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। এটি বিশেষত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান এবং আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ISKCON)-এর সদর দপ্তর হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
মায়াপুরের প্রধান আকর্ষণসমূহ:
* শ্রী মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির (ইস্কন মন্দির): মায়াপুরের মূল আকর্ষণ হলো ইস্কন মন্দির, যা চন্দ্রোদয় মন্দির নামেও পরিচিত। এটি ইস্কনের প্রথম মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম। এখানে শ্রী পঞ্চতত্ত্ব, শ্রী শ্রী রাধা-মাধব ও অষ্টসখী এবং শ্রী নৃসিংহদেবের অপূর্ব বিগ্রহ দর্শন করা যায়। এই মন্দিরের বিশালতা, পরিচ্ছন্নতা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ দেশ-বিদেশ থেকে ভক্ত ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
মন্দির খোলার সময়: সাধারণত সকাল ৭:৩০ থেকে দুপুর ১:০০টা পর্যন্ত এবং আবার বিকেল ৩:৩০ থেকে রাত ৮:৩০ পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
* শ্রীল প্রভুপাদের সমাধি মন্দির: ইস্কনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই সুন্দর মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে।
* যোগপীঠ: এটি হলো শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান। ১৪৮৬ সালে তিনি এখানেই জন্মগ্রহণ করেন। এই পবিত্র স্থানে ভক্তরা ভক্তিভরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
* টেম্পল অফ বৈদিক প্ল্যানেটারিয়াম (নির্মাণাধীন): এটি বর্তমানে নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম মন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এই মন্দিরে বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের একটি প্ল্যানেটারিয়াম থাকবে, যা বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে মহাবিশ্বের ধারণা তুলে ধরবে।
* শ্রীচৈতন্য মঠ: এই মঠটি মায়াপুর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে শ্রীশ্রী রাধা কুন্ড, শ্যামা কুন্ড ও গোবর্ধন দর্শন করা যায়।
* ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর মোহনা: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এই স্থানটিও অন্যতম আকর্ষণীয়।
* বৈদিক মন্দির (Temple of the Vedic Planetarium – TOVP): এটি নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম এবং এর উচ্চতা ও বিশালতা দর্শনীয়।
* মায়াপুর গোশালা (Mayapur Goshala): ইসকনের নিজস্ব এই গোশালায় বিভিন্ন প্রজাতির গরুদের দেখা যায়। এখানকার খাঁটি ঘি সুপরিচিত।
* রাধাকুন্ড ও শ্যামকুন্ড: মন্দিরের কাছেই অবস্থিত এই পবিত্র স্থান দুটিও দর্শনীয়।
* ভাগীরথী ও জলঙ্গি নদীর মোহনা: কাছেই এই দুটি নদীর মিলনস্থল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
* চাঁদ কাজীর সমাধি: বৈষ্ণব ও শাক্ত সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের নিদর্শন হিসেবে এই ঐতিহাসিক স্থানটিও দেখতে পারেন।
* বল্লাল সেনের ঢিবি: বাংলার রাজা বল্লাল সেনের রাজ বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী, এটিও দেখে নিতে পারেন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
* মহাপ্রসাদ/ভোগ: ইসকনে নির্দিষ্ট সময়ে মহাভোগ বিতরণ করা হয়। এর জন্য আগে থেকে কুপন সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া গোবিন্দাস রেস্টুরেন্ট বা অন্যান্য ক্যান্টিনেও সাত্ত্বিক খাবার পাওয়া যায়।
* নিয়মাবলী: মন্দির চত্বরের ভিতরে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন এবং চামড়ার জিনিস (যেমন ব্যাগ, বেল্ট) নিয়ে প্রবেশ নিষেধ থাকে। এগুলি গেস্ট হাউজে বা লকারে জমা রেখে যেতে হয়। সমাধি মন্দিরের ভেতরে ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
* উৎসব: রথযাত্রা, জন্মাষ্টমী, গৌর পূর্ণিমা (শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি) সহ বিভিন্ন বৈষ্ণব উৎসবে মায়াপুরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। এই সময় রুম বুকিং আগে থেকে করে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
মায়াপুর একটি শান্ত এবং ভক্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য পরিচিত। আপনি এখানে গেলে প্রকৃতির মাঝে আধ্যাত্মিক শান্তির অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
কোথায় থাকবেন (Accommodation)
ইসকন মন্দির চত্বরের ভিতরে বা আশেপাশে বেশ কয়েকটি থাকার ব্যবস্থা রয়েছে:
* ইসকনের নিজস্ব গেস্ট হাউজ: গদা ভবন, শঙ্খ ভবন (Conch Bhavan), চৈতন্য ভবন, গীতা ভবন, ঈশোদ্যান ভবন (Ishodyan Bhavan) ইত্যাদি। এগুলির রুম বুকিং-এর জন্য আগে থেকে অনলাইনে বা ফোন করে যোগাযোগ করা ভালো।
* প্রাইভেট হোটেল/লজ: ইসকন চত্বরের বাইরেও অনেক হোটেল ও লজ পাওয়া যায়।
কিভাবে এখানে আসবেন
মায়াপুর কলকাতা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
* রেলপথে: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে কৃষ্ণনগর সিটি জংশন স্টেশন পর্যন্ত আসুন। সেখানে থেকে অটো বা বাসে করে মায়াপুর ঘাট বা স্বরূপগঞ্জ ঘাটে যেতে হবে। ঘাট থেকে নৌকা বা ভেসেল পার হয়ে টোটো/অটোতে করে ইসকন মন্দিরে পৌঁছানো যায়। অথবা, কিছু ট্রেন নবদ্বীপ ধাম স্টেশন পর্যন্ত যায়। সেখান থেকেও একই ভাবে টোটো/অটো ও নৌকা/ভেসেল পার হয়ে মায়াপুরে পৌঁছানো যায়।
* সড়কপথে: কলকাতা থেকে বাসে করে সরাসরি ধুবুলিয়া চৌরাস্তায় নামতে পারেন। সেখান থেকে টোটো বা বাসে মায়াপুর ইসকন মন্দিরের মেন গেটে পৌঁছানো যায়।
* বর্তমানে কলকাতা থেকে মায়াপুর সরাসরি ভলভো বাস ও চলাচল করে।
