পলাশী মনুমেন্ট
পলাশী মনুমেন্ট একটি ঐতিহাসিক স্থান যা ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। এই স্থানটি পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলায় ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত এবং এটি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলা এবং লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে হওয়া সেই যুদ্ধের সাক্ষ্য দেয়, যা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করেছিল। পলাশী মনুমেন্ট ভ্রমণ ইতিহাসের এক গভীর অভিজ্ঞতা দেবে, যেখানে ভারতের স্বাধীনতা হারানোর বেদনা এবং পরবর্তীকালের সংগ্রামের বীজ রোপিত হয়েছিল।
পলাশী মনুমেন্ট: ঐতিহাসিক ভ্রমণ বিবরণ
মনুমেন্ট এবং স্মৃতিস্তম্ভ
* পলাশী মনুমেন্ট (Plassey Monument): এটি একটি লম্বা স্তম্ভ যা মূলত ব্রিটিশদের বিজয়কে চিহ্নিত করার জন্য ১৮৮৩ সালে স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরে লর্ড কার্জনের সময়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এই মনুমেন্টটি এখন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)-এর রক্ষণাবেক্ষণের অধীনে আছে।
* সিরাজ উদ-দৌলার মূর্তি: মনুমেন্টের কাছেই নবাব সিরাজ উদ-দৌলার একটি স্বর্ণাভ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা স্বাধীনতা সংগ্রামী ও নবাবের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তৈরি।
* শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ: এখানে তিনটি ছোট স্তম্ভ (Obelisks) রয়েছে যা নবাবের সেনাপতি মীর মদন, বাহাদুর আলী খান এবং নউয়ে সিং হাজারী-সহ অন্যান্য শহীদদের উৎসর্গীকৃত, যারা যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এই স্থানটি নবাবের বীর সেনানীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
যুদ্ধক্ষেত্র
* পলাশীর প্রান্তর: মনুমেন্টটি ভাগীরথী নদীর তীরে সেই ঐতিহাসিক আমবাগান সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। যদিও নদীর ভাঙনে মূল যুদ্ধক্ষেত্রের অনেকটা অংশই এখন বিলীন হয়ে গেছে। আপনি খোলা মাঠ এবং চারপাশের সর্ষে ক্ষেত (ঋতুভেদে) দেখতে পাবেন, যা আপনাকে ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
* পলাশী সুগার মিল: মনুমেন্টটি পলাশী সুগার মিল-এর কাছে অবস্থিত।
ভ্রমণের সেরা সময়
* শীতকাল অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস ভ্রমণের জন্য আদর্শ, যখন আবহাওয়া মনোরম থাকে। গ্রীষ্মকালে দিনের বেলা তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, তাই হালকা সুতির পোশাক পরা ভালো।
পলাশী ভ্রমণ আপনাকে কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ দেখাবে না, বরং ভারতীয় ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের সূচনাপর্বকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে।
কিছু টিপস
* সময়: মনুমেন্ট ঘুরে দেখতে প্রায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে।
* পোশাক: গরমকালে গেলে অবশ্যই হালকা সুতির পোশাক এবং রোদ থেকে বাঁচতে টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করুন।
* খাবারের ব্যবস্থা: আশেপাশে খাবারের জন্য স্থানীয় কিছু দোকান পাওয়া যায়, তবে কৃষ্ণনগর বা বহরমপুর থেকে খাবার নিয়ে গেলে সুবিধা হবে।
* অন্যান্য স্থান: পলাশী থেকে ফেরার পথে নদিয়া জেলার অন্যান্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান যেমন নবদ্বীপ (চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান), মায়াপুর (ইসকন মন্দির) অথবা কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি এবং মাটির পুতুল-এর বাজার (ঘূর্ণী) দেখে আসতে পারেন।
Google Maps
কিভাবে এখানে আসবেন
* অবস্থান: পলাশী পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি কলকাতা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে।
* ট্রেনে: শিয়ালদহ থেকে লোকাল ট্রেন বা এক্সপ্রেসে (যেমন ধানো ধান্য এক্সপ্রেস, হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস) চেপে পলাশী রেলওয়ে স্টেশন-এ নামতে পারেন। স্টেশন থেকে মনুমেন্ট প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে, যা অটো বা রিকশায় যাওয়া যায়।
* সড়কপথে: কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ১২ (NH-12) ধরে সড়কপথেও পলাশী যাওয়া যায়। রাস্তার পাশেই পলাশী ওয়ার মেমোরিয়ালের তোরণ দেখতে পাবেন।
