সজনেখালি ব্যাঘ্র প্রকল্প

সুন্দরবনের কোলে অবস্থিত সজনেখালি ব্যাঘ্র প্রকল্প (Sajnekhali Tiger Reserve) প্রকৃতিপ্রেমী এবং রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য। এটি মূলত সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। 

১. সজনেখালির আকর্ষণ :

সজনেখালি মূলত একটি ওয়াচটাওয়ার (Watchtower) এবং ব্যাঘ্র প্রকল্পের প্রধান কেন্দ্র। এখানে দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে:

 * ওয়াচটাওয়ার: এখান থেকে সুন্দরবনের ঘন জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ ও কুমির দেখার সুযোগ থাকে।

 * ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার: সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জানার একটি চমৎকার তথ্যকেন্দ্র। এটি মূলত একটি মিউজিয়াম বা জাদুঘর হিসেবে কাজ করে। এখানে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ (যেমন: সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া), নানা ধরনের মাছ এবং সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, কুমির এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীদের জীবনচক্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত জানা যায়। পর্যটকদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করতে এবং ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে এখানে বিভিন্ন স্লাইড-শো বা তথ্যচিত্র দেখানো হয়। সহজ কথায়, এটি সুন্দরবনের জঙ্গল ভ্রমণের আগে এই রহস্যময় বনভূমি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার জন্য সেরা জায়গা।

 * কুমির প্রকল্প: এটি মূলত লোনা জলের কুমিরের একটি ছোট সংরক্ষণ কেন্দ্র। সুন্দরবনের লোনা জলের কুমিরদের (Saltwater Crocodile) একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় করা এবং তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে পর্যটকদের সচেতন করা। এখানে বিশাল আকৃতির কুমিরদের রোদ পোহাতে বা জলের কিনারে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় ছোট ছোট কুমিরছানাদেরও (Hatchlings) আলাদা ট্যাঙ্কে রাখা হয়।

* কচ্ছপ প্রকল্প: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংরক্ষণ প্রকল্প, কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ নিয়ে কাজ করে। এখানে মূলত ‘বাটাগুর বাস্কা’ (Batagur Baska) বা ‘কেটো কচ্ছপ’ সংরক্ষণ ও প্রজনন করা হয়। এই প্রজাতির কচ্ছপ বর্তমানে প্রকৃতিতে প্রায় বিরল। ২০১২ সাল থেকে বন দপ্তর এবং টার্টল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স (TSA) যৌথভাবে এখানে কচ্ছপ প্রজনন শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যে কচ্ছপের সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৪০০-র কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। এখান থেকে প্রাপ্ত কচ্ছপছানাগুলো বড় হওয়ার পর তাদের পিঠে চিপ বা ট্রান্সমিটার লাগিয়ে সুন্দরবনের নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।

 * বনবিবির মন্দির: সুন্দরবনের লোকসংস্কৃতি বোঝার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সুন্দরবনের প্রতিটি ক্যাম্পে আপনি বনবিবির মন্দির দেখতে পাবেন।

২. সেরা সময়

 * শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি): এটি ভ্রমণের সেরা সময়। আবহাওয়া খুব মনোরম থাকে এবং বাঘ দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

 * বর্ষাকাল ও গ্রীষ্মকাল: এই সময় আর্দ্রতা এবং ঝড়ের ভয় থাকে, তাই এড়িয়ে চলাই ভালো।

৩. পারমিট ও খরচ

সজনেখালি প্রবেশের জন্য বন দপ্তরের অনুমতি (Permit) প্রয়োজন।

 * আপনি যদি কোনো ট্যুর অপারেটরের সাথে যান, তারাই পারমিটের ব্যবস্থা করবে।

 * নিজে গেলে সজনেখালি কাউন্টার থেকে পারমিট নিতে হবে।

 * সঙ্গে অবশ্যই একটি ফটো আইডি প্রুফ (আধার কার্ড/ভোটার কার্ড) রাখবেন।

৪. থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা

সজনেখালিতে থাকার জন্য সবথেকে জনপ্রিয় হলো সরকারি সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজ (WBTDCL)। এছাড়া নদীর ওপারে দয়াপুর বা পাখিরালয়ে অনেক বেসরকারি হোটেল বা রিসোর্ট রয়েছে।

 * লঞ্চেই সাধারণত দুপুরের ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকে (যদি প্যাকেজ ট্যুরে যান)।

 * স্থানীয় দেশি মুরগি এবং টাটকা মাছের ঝোল এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।

ভ্রমণ টিপস:

 * পোশাক: বনের পরিবেশের সাথে মানানসই হালকা রঙের (যেমন: অলিভ গ্রিন, খাকি বা ধূসর) পোশাক পরুন। উজ্জ্বল লাল বা হলুদ রঙ বন্যপ্রাণীদের বিচলিত করতে পারে।

 * শব্দ: বনে শান্ত থাকুন। উচ্চস্বরে গান বাজানো বা চিৎকার করা নিষিদ্ধ।

 * প্লাস্টিক: সুন্দরবন ‘প্লাস্টিক মুক্ত অঞ্চল’, তাই কোনো আবর্জনা নদীতে বা বনে ফেলবেন না।

 * বাইনোকুলার: দূর থেকে বাঘ বা পাখি দেখার জন্য সাথে একটি বাইনোকুলার অবশ্যই রাখুন।

কিভাবে এখানে আসবেন

সজনেখালি যাওয়ার প্রধান উপায় হলো জলপথ।

 * ট্রেনে: শিয়ালদহ থেকে লোকাল ট্রেনে ক্যানিং (Canning) স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে অটো বা ম্যাজিক ভ্যানে সোনাখালি বা গদখালি জেটিঘাট।

 * বাসে/গাড়িতে: কলকাতা থেকে সরাসরি সায়েন্স সিটি হয়ে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে সোনাখালি বা গদখালি যাওয়া যায়।

 * জলপথ: সোনাখালি বা গদখালি থেকে নৌকা বা লঞ্চে চড়ে সজনেখালি পৌঁছাতে হয়। এই যাত্রাপথটি অত্যন্ত মনোরম।

সুন্দরবন প্যাকেজ ট্যুর অপারেটর

R.S Tour & Travels

Mob: +91 9832411997

Google Maps

Scroll to Top