শান্তিপুর ও ফুলিয়ার তাঁত শিল্প
শান্তিপুরের তাঁত শিল্প পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত শিল্পগুলির মধ্যে একটি। এটি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ তাঁত বয়ন শিল্পাঞ্চল। এই শিল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. পরিচিতি ও গুরুত্ব:
* স্থান: পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শান্তিপুর এবং পার্শ্ববর্তী ফুলিয়া হল এই তাঁত শিল্পাঞ্চলের মূল কেন্দ্র।
* বিখ্যাত: শান্তিপুরের তাঁত শিল্প মূলত সুতির শাড়ি উৎপাদনের জন্য জগৎ বিখ্যাত। এখানকার শাড়ি ‘শান্তিপুরী শাড়ি’ নামে পরিচিত।
* প্রাচীনত্ব: তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে (প্রায় ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে) গৌড়ের রাজা গণেশ দনুজাধর্মণদেবের শাসনকালে শান্তিপুরে বয়নশিল্প শুরু হয়েছিল।
* ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের উপদেশে বাংলাদেশের ঢাকা, টাঙ্গাইল, বিক্রমপুর ও অন্যান্য এলাকা থেকে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অনেক তাঁতি শান্তিপুরে এসে বসবাস শুরু করেন এবং তাদের পেশা চালিয়ে যান। রাজা রুদ্র দেব রায়ের (১৬৮৩- ১৬৯৪) সময় থেকে বাণিজ্যিক ভাবে শাড়ি বোনার ঝোঁক বাড়ে।
২. উৎপাদিত পণ্য ও বিশেষত্ব:
* পণ্য: প্রধানত বিভিন্ন ধরনের সুতির শাড়ি, ধুতি, পোশাকের উপকরণ, উত্তরীয় ও ওড়না তৈরি হয়।
* শান্তিপুরী শাড়ির বৈশিষ্ট্য:
* সূক্ষ্ম বয়ন: শান্তিপুরী শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর সূক্ষ্ম বয়নবিন্যাস এবং নকশা করা পাড় (Border)।
* আরামদায়ক: নরম, মসৃণ ও হালকা ওজন বিশিষ্ট হওয়ায় এই শাড়ি অত্যন্ত আরামদায়ক।
* নকশা: তাঁতিরা বুননের মাধ্যমে শাড়ির পাড়ে বিভিন্ন নকশার সৃষ্টি করেন, যেমন – ফুল, জ্যামিতিক আকৃতি, এমনকি পৌরাণিক ঘটনাবলী বা মন্দিরের নকশাও আঁচলে দেখা যায়।
* প্রকারভেদ: অতীতে নকশা, সুতা ও রঙের ভিত্তিতে শান্তিপুরে প্রায় দশ ধরণের শাড়ি উৎপাদিত হত, যার মধ্যে নীলাম্বরী ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত।
* ফুলিয়ার টাঙ্গাইল-জামদানি: এই শিল্পাঞ্চলের অন্য কেন্দ্র ফুলিয়া টাঙ্গাইল এবং জামদানি কাজের সংমিশ্রণে তৈরি শাড়ির জন্য সুপরিচিত।
৩. বর্তমান অবস্থা ও সমস্যা:
* সংকট: ঐতিহ্যবাহী এই হস্তচালিত তাঁত শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের সম্মুখীন।
* সমস্যা:
* কম মজুরি ও মহাজনী ব্যবস্থা: তাঁতিরা মহাজনদের থেকে ন্যূনতম মজুরি পান এবং মহাজনী ব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয়, ফলে তাঁতিদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
* অসম প্রতিযোগিতা: বাইরের রাজ্য থেকে আসা সস্তা পাওয়ারলুমের কাপড়ের সাথে হস্তচালিত তাঁত কাপড়ের তীব্র অসম প্রতিযোগিতা।
* সুতো ও জিএসটি: তাঁতের সুতোর (হ্যাঙ্ক ইয়ার্ন) সংকট, জিএসটি এবং অন্যান্য সরকারি নীতির কারণে হস্তচালিত তাঁত শিল্প দুর্বল হয়েছে।
* যন্ত্রনির্ভরতা: অনেক তাঁতি পেশা পরিবর্তন করছেন বা হস্তচালিত তাঁতের বদলে পাওয়ারলুমের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁত হারিয়ে যাওয়ার পথে।
শান্তিপুরের তাঁত শিল্প কেবল একটি শিল্প নয়, এটি বাংলার দীর্ঘদিনের বয়ন ঐতিহ্যের প্রতীক। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁতিদের ন্যায্য মজুরি ও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
পরামর্শ:
* তাঁত শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য ট্রেনে যাওয়াই সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী।
* ফুলিয়া স্টেশন শান্তিপুর স্টেশনের কিছুটা আগে, তাই ফুলিয়ার টাঙ্গাইল-জামদানি শিল্প দেখতে গেলে ফুলিয়া স্টেশনেই নামা উচিত।
* শান্তিপুর ও ফুলিয়াতে বিভিন্ন তাঁতি পাড়ায় ঘুরে দেখার জন্য স্টেশনে নেমে টোটো বা অটো ভাড়া করতে পারেন।
Google Maps
কিভাবে এখানে আসবেন
শান্তিপুর এবং ফুলিয়া, দুটিই নদিয়া জেলায় অবস্থিত এবং কলকাতার খুব কাছে। রেল ও সড়ক পথে আপনি সহজে এই স্থানগুলিতে পৌঁছাতে পারবেন।
১. ট্রেন পথে (সবচেয়ে সুবিধাজনক)
শান্তিপুর ও ফুলিয়া উভয় স্থানেই ট্রেন স্টেশন রয়েছে এবং শিয়ালদহ থেকে সরাসরি লোকাল ট্রেন পরিষেবা পাওয়া যায়।
২. সড়ক পথে (বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি)
কলকাতা থেকে শান্তিপুর এবং ফুলিয়ার সড়ক দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার।
* বাস: ধর্মতলা (এসপ্ল্যানেড) বা বাবুঘাট থেকে সরাসরি শান্তিপুর বা কৃষ্ণনগরগামী সরকারি বা বেসরকারি বাস পাওয়া যায়। বাসে শান্তিপুর পৌঁছাতে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে, যা রাস্তার ট্র্যাফিকের ওপর নির্ভর করে।
* শান্তিপুর পৌঁছানোর পর সেখান থেকে ফুলিয়া বা তাঁত শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য অংশে যাওয়ার জন্য স্থানীয় অটো বা টোটো ব্যবহার করতে পারেন।
* ব্যক্তিগত গাড়ি/ট্যাক্সি: কলকাতা থেকে শান্তিপুর বা ফুলিয়া যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বা ট্যাক্সি ভাড়া নিতে পারেন।
* দূরত্ব: প্রায় ৯৩-৯৯ কিমি।
* সময়: ট্র্যাফিক না থাকলে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
