শিবনিবাস শিব মন্দির
শিবনিবাস শিব মন্দির (Shivnibas Shiva Temple) হলো পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার মাজদিয়ার কাছে অবস্থিত একটি প্রাচীন মন্দির ও ঐতিহাসিক তীর্থস্থান। এটি তার বিশাল শিবলিঙ্গ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য “বাংলার কাশী” নামে পরিচিত।
শিবনিবাসের পরিচিতি ও ইতিহাস
* নামের উৎস: ‘শিবনিবাস’ শব্দের অর্থ ‘শিবের বাসস্থান’। লোককথা অনুযায়ী, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বর্গী আক্রমণের সময় সাময়িকভাবে মাজদিয়ায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন এবং সেই স্থানে শিব প্রতিষ্ঠা করে নাম রাখেন শিবনিবাস।
* প্রতিষ্ঠা: কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৬৭৬ শকাব্দে) এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
* মন্দিরসমূহ: মূলত মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় এখানে মোট তিনটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, যা বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে।
* রাজরাজেশ্বর মন্দির (বুড়ো শিব মন্দির): এটি প্রধান শিব মন্দির।
* বিশেষত্ব: এই মন্দিরে রয়েছে পূর্ব ভারতের বৃহত্তম এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গটির উচ্চতা প্রায় ৯ ফুট থেকে ১১ ফুট ৯ ইঞ্চি পর্যন্ত বলে বিভিন্ন মতে উল্লিখিত। স্থানীয়ভাবে এটি ‘বুড়ো শিব’ নামে পরিচিত। মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ১২০ ফুট এবং এর স্থাপত্যশৈলী বাংলার প্রচলিত মন্দির রীতির থেকে কিছুটা ভিন্ন।
* প্রতিষ্ঠাকাল: ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ। মহারাজ এটি তাঁর প্রথমা মহিষীর নামে উৎসর্গ করেন।
* রাজ্ঞীশ্বর মন্দির: এটি দ্বিতীয় শিব মন্দির।
* বিশেষত্ব: এই মন্দিরের শিবলিঙ্গটি প্রায় ৭ ফুট উঁচু। এটি চার চালাবিশিষ্ট এবং উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট।
* প্রতিষ্ঠাকাল: ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দ। মহারাজ এটি তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী রাজ্ঞীশ্বরী দেবীর জন্য তৈরী করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে।
* রাম-সীতা মন্দির: এটি চার চালাবিশিষ্ট মন্দির এবং এখানে কষ্টিপাথরের রামচন্দ্র এবং অষ্টধাতুর দেবী সীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তি রয়েছে।
* প্রতিষ্ঠাকাল: ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দ।
* স্থান: মন্দিরগুলি চূর্ণী নদীর তীরে অবস্থিত। নদী পেরোনোর জন্য আগে বাঁশের সাঁকো ছিল, তবে এখন কংক্রিটের সেতু হয়েছে, যা যাতায়াতকে আরও সহজ করেছে।
ভ্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
কখন যাবেন
* শিবনিবাস সারা বছরই খোলা থাকে।
* মহাশিবরাত্রি উৎসব: এই সময় এখানে বিরাট মেলা বসে এবং প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।
* শ্রাবণ মাস: শ্রাবণ মাসে শিবলিঙ্গে জল ঢালার বিশেষ আয়োজন হয়, এই সময়েও প্রচুর ভিড় হয়।
কী কী দেখবেন
* রাজরাজেশ্বর মন্দির: প্রধান আকর্ষণ, ৯ ফুটের বেশি উঁচু কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ দর্শন। ভক্তদের সিঁড়ি দিয়ে উঠে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে হয়।
* রাজ্ঞীশ্বর মন্দির: দ্বিতীয় শিব মন্দির।
* রাম-সীতা মন্দির: রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের কষ্টিপাথর ও অষ্টধাতুর মূর্তি।
* চূর্ণী নদী: মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী ও তার পারের শান্ত পরিবেশ।
কোথায় থাকবেন ও খাবেন
* শিবনিবাসে থাকা বা খাওয়ার খুব উন্নত মানের ব্যবস্থা নেই, তবে সাধারণ খাবারের দোকান ও স্থানীয় ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে।
* সুবিধাজনক থাকার ও খাওয়ার জন্য নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর-এ ভালো হোটেল ও রেস্তোরাঁ পাওয়া যায়।
* কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মিষ্টি সরপুরিয়া এবং সরভাজা খেতে ভুলবেন না।
শিবনিবাস ভ্রমণের সংক্ষিপ্ত টিপস
* এটি এক দিনের ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত স্থান।
* পানীয় জল এবং মশা তাড়ানোর ক্রিম (Mosquito Repellent) সঙ্গে রাখুন।
* বর্ষাকালে গেলে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিয়ে যান।
* মন্দিরের আশেপাশে ছবির অনুমতি নাও থাকতে পারে, তাই ছবি তোলার আগে জেনে নিন।
* শান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ উপভোগ করার জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা।
কিভাবে এখানে আসবেন
শিবনিবাস নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার এবং রাজ্যের রাজধানী কলকাতা থেকে প্রায় ১১৩-১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
* রেলপথে:
* কলকাতা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে গেদে লোকাল ট্রেনে উঠে মাজদিয়া স্টেশনে নামতে হবে।
* মাজদিয়া স্টেশন থেকে টোটো বা অটো ভাড়া করে শিবনিবাসে পৌঁছানো যায় (প্রায় ৩-৫ কিলোমিটার)।
* সড়কপথে:
* কলকাতা থেকে সড়কপথে কৃষ্ণনগর হয়ে শিবনিবাস যাওয়া যায়।
* কৃষ্ণনগর থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করেও শিবনিবাস পৌঁছানো যায়।
