শ্যাম চাঁদ মন্দির
পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার শান্তিপুর একটি ঐতিহাসিক এবং সংস্কৃতি সমৃদ্ধ শহর। এখানে বহু প্রাচীন মন্দির এবং পুরাকীর্তি রয়েছে। শান্তিপুরের অন্যতম বিখ্যাত এবং দর্শনীয় স্থান হলো শ্যাম চাঁদ মন্দির।
মন্দিরের ইতিহাস ও স্থাপত্য:
* প্রতিষ্ঠা: শ্যাম চাঁদ মন্দির ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে) শান্তিপুরের এক ধনী তন্তুবায় ব্যবসায়ী রামগোপাল খাঁ চৌধুরী কর্তৃক নির্মিত হয়। মন্দিরটি নির্মাণে তৎকালীন সময়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল।
* স্থাপত্যশৈলী: এই মন্দিরটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী “আটচালা” রীতিতে নির্মিত। এটি ১১০ ফুট উঁচু এবং ৬৮ ফুট প্রশস্ত। মন্দিরের সামনের অংশে পাঁচটি খিলান রয়েছে, যা পোড়ামাটির কারুকার্যে সজ্জিত ছিল, যদিও সময়ের সাথে সাথে সেই কারুকার্য ম্লান হয়ে গেছে। মন্দিরের মধ্যে স্থাপিত বিগ্রহটি কষ্টিপাথরের তৈরি।
* ধর্মীয় গুরুত্ব: শ্যাম চাঁদ মন্দিরের প্রধান বিগ্রহ হলেন রাধাকৃষ্ণ। শান্তিপুরের ইতিহাস বৈষ্ণব ধর্ম আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর প্রধান সহযোগী অদ্বৈতাচার্যের কারণে শান্তিপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। শ্যাম চাঁদ মন্দির সেই বৈষ্ণব ঐতিহ্যেরই একটি অংশ।
বিশেষ উৎসব ও আকর্ষণ:
* রাস উৎসব: শান্তিপুরের রাস উৎসব অত্যন্ত বিখ্যাত এবং জনপ্রিয়। শ্যাম চাঁদ মন্দিরের রাস উৎসবে বিগ্রহকে মন্দিরের সামনে বিশেষ মঞ্চে অধিষ্ঠিত করা হয়, তবে শোভাযাত্রায় বের করা হয় না।
* দোলযাত্রা: দোল উৎসবের সময় শ্যাম চাঁদ বিগ্রহ নগর পরিক্রমায় বের হন।
* অন্যান্য উৎসব: পৌষ মাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশীতে এখানে ১৫ দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও, জন্মাষ্টমী, ঝুলন এবং অন্যান্য বৈষ্ণবীয় উৎসবও এখানে সাড়ম্বরে পালিত হয়।
ভ্রমণের সময়:
* সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।
* যেকোনো সময় শান্তিপুর ভ্রমণ করা যেতে পারে। তবে, রাস উৎসব বা দোলযাত্রার সময় গেলে মন্দির এবং শহরের ভিন্ন রূপ উপভোগ করা যাবে।
আশেপাশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান:
শান্তিপুরে শ্যাম চাঁদ মন্দির ছাড়াও আরও অনেক ঐতিহাসিক স্থান ও মন্দির রয়েছে:
* অদ্বৈতাচার্য শ্রীপাট: বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
* জালেশ্বর মন্দির: এটিও পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকার্যের জন্য পরিচিত।
* তপখানা মসজিদ: ১৬০০ সালের পুরনো এই মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে।
* শান্তিপুর তাঁতশিল্প: শান্তিপুর তার বিখ্যাত তাঁত শাড়ির জন্য সারা ভারতে পরিচিত। তাঁতশিল্পের কর্মশালা এবং তাঁতের হাট ঘুরে দেখা যেতে পারে।
টিপস:
* শান্তিপুরের রাস্তাঘাট তুলনামূলকভাবে সরু, তাই গাড়ি সাবধানে চালানো উচিত।
* খাওয়াদাওয়ার জন্য স্থানীয় মিষ্টি এবং জলখাবার উপভোগ করা যেতে পারে।
* বাসস্থান বা থাকার জন্য শান্তিপুর পৌরসভা গেস্ট হাউস বা অন্যান্য হোমস্টে এবং লজ রয়েছে।
শ্যাম চাঁদ মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি বাংলার স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। শান্তিপুরের তাঁতশিল্প, রাস উৎসব এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে এই স্থানটি একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা প্রদান করবে।
কিভাবে এখানে আসবেন
* রেলপথে: শান্তিপুরের সবচেয়ে সুবিধাজনক যোগাযোগ মাধ্যম হলো ট্রেন। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে শান্তিপুর জংশন পর্যন্ত নিয়মিত EMU লোকাল ট্রেন চলাচল করে। শান্তিপুর জংশন থেকে রিকশা বা টোটো করে সহজেই মন্দিরে পৌঁছানো যায়। মন্দিরটি স্টেশন থেকে প্রায় ৩ কিমি দূরে অবস্থিত।
* সড়কপথে: কলকাতা থেকে শান্তিপুরের দূরত্ব প্রায় ৭৭ কিলোমিটার। বিভিন্ন রাজ্য সড়ক এবং জাতীয় সড়ক ১২ (NH 12) হয়ে এখানে পৌঁছানো যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাসেও যাতায়াত করা সম্ভব।
