মা বর্গভীমা মন্দির

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক (প্রাচীন তাম্রলিপ্ত) শহরে অবস্থিত মা বর্গভীমা মন্দির একটি অত্যন্ত জাগ্রত শক্তিপীঠ।

ইতিহাস

এই মন্দিরের ইতিহাস এবং স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। মনে করা হয় এই মন্দিরটি প্রায় ১১৫০-১২০০ বছরের পুরোনো। প্রাচীন তাম্রলিপ্তের ময়ূরবংশীয় রাজা নিংশুন্ত বা তাম্রধ্বজের আমলে এটি নির্মিত হয়েছিল বলে প্রচলিত আছে। মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ হলেও, ইতিহাসবিদদের মতে এর সাথে বৌদ্ধ ধর্মের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি আসলে একটি বৌদ্ধ বিহার বা স্তূপের ওপর নির্মিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। পৌরাণিক কাহিনী মতে সতীপীঠ হিসেবে এখানে দেবীর বাম পায়ের গোড়ালি পড়েছিল বলে মানা হয়। আবার অন্য এক কাহিনী অনুযায়ী, দেবী এখানে এক জেলেকে বর দিয়েছিলেন, যার নাম থেকে ‘বর্গভীমা’ নামের উৎপত্তি।

স্থাপত্যশৈলী

মা বর্গভীমা মন্দিরের স্থাপত্যে প্রধানত তিনটি ভিন্ন রীতির ছাপ লক্ষ্য করা যায়—হিন্দু, বৌদ্ধ এবং ওড়িশি। মন্দিরটি একটি বিশাল উঁচু বেদির ওপর নির্মিত। এর দেওয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু এবং মজবুত। মন্দিরের চূড়া বা শিখরটি ওড়িশার ‘রেখ দেউল’ স্থাপত্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরের গর্ভগৃহটি বেশ অন্ধকার এবং রহস্যময়। এখানে দেবী বর্গভীমার মূর্তিটি একটি বিশাল কালো পাথরের তৈরি। মূর্তিটির গঠন অনেকটা মহাযান বৌদ্ধধর্মের ‘উগ্রতারা’ বা ‘নীল সরস্বতী’র মতো, যার চারটি হাত রয়েছে এবং পায়ে শব রয়েছে।

নির্মাণ উপকরণ 

মন্দিরটি মূলত চুন-সুরকি এবং পোড়ামাটির ইটের তৈরি। যদিও কালক্রমে সংস্কারের ফলে বাইরের অনেক কারুকাজ ঢাকা পড়েছে, তবুও এর আদি কাঠামোটি এখনো অটুট। মন্দির চত্বরটি মূলত চারটি অংশে বিভক্ত— মূল মন্দির (গর্ভগৃহ), জগমোহন (নাটমন্দির), যজ্ঞশালা এবং ভোগশালা।

বিশেষ বৈশিষ্ট্য

অজেয় শক্তি লোককথা অনুযায়ী, কালাপাহাড় যখন বাংলার মন্দিরগুলো ধ্বংস করছিলেন, তখন তিনি এই বর্গভীমা মন্দিরে এসে অলৌকিক কোনো কারণে মন্দিরটি ধ্বংস করতে পারেননি এবং পিছু হঠতে বাধ্য হন।

মাছের ভোগ 

এই মন্দিরের একটি বিশেষত্ব হলো দেবীকে প্রতিদিন মাছের ভোগ দেওয়া হয়, যা বাংলার শাক্ত সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিফলন।

তমলুকের প্রাচীন ইতিহাসের নিরিখে এই মন্দিরটি আজও ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। আপনার যদি প্রাচীন শিলালিপি বা মূর্তিবিদ্যা নিয়ে আগ্রহ থাকে, তবে মন্দিরের ভেতরের খিলানগুলো ভালো করে লক্ষ্য করতে পারেন।

দর্শনের সময় ও নিয়ম

মন্দির সাধারণত ভোরবেলায় খোলে এবং দুপুরে ভোগ আরতির পর কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ থাকে। পুনরায় বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আপনি যদি মন্দিরে দুপুরের অন্নভোগ খেতে চান, তবে সকালের মধ্যে কুপন সংগ্রহ করতে হবে। এখানকার মাছের ভোগ বেশ বিখ্যাত।

আশেপাশের দর্শনীয় স্থান

তমলুক একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর, তাই মন্দিরের পাশাপাশি আপনি ঘুরে দেখতে পারেন।

 তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি: ধ্বংসাবশেষ হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

 তাম্রলিপ্ত মিউজিয়াম: প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরের ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখার জন্য সেরা জায়গা।

 রূপনারায়ণ নদ: বিকেলে নদীর পাড়ে সময় কাটানো খুব মনোরম।

ভ্রমণের সেরা সময়

সারা বছরই এখানে যাওয়া যায়, তবে শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। এছাড়া কালীপুজো ও চৈত্র সংক্রান্তিতে মন্দিরে বিশেষ উৎসব ও মেলা বসে, যা দেখার মতো অভিজ্ঞতা।

কিছু প্রয়োজনীয় টিপস

মন্দিরের ভেতরে সাধারণত ছবি তোলা নিষেধ, তাই প্রবেশের আগে নিয়ম জেনে নিন। শনিবার বা মঙ্গলবার ভিড় একটু বেশি থাকে, নিরিবিলিতে দর্শনের জন্য সপ্তাহের অন্য দিনগুলো বেছে নিতে পারেন।

কিভাবে এখানে আসবেন

তমলুক শহরটি কলকাতা থেকে খুব কাছেই অবস্থিত:

 ট্রেনে: হাওড়া থেকে দিঘাগামী বা হলদিয়াগামী ট্রেনে উঠে তমলুক স্টেশনে নামতে হবে। স্টেশন থেকে টোটো বা রিকশায় ১০-১৫ মিনিটে মন্দিরে পৌঁছানো যায়।

 বাসে: ধর্মতলা বা সাঁতরাগাছি থেকে দিঘা বা হলদিয়াগামী বাসে উঠে তমলুক নিমতৌড়ি বা তমলুক মোড়ে নামতে হবে।

 গাড়িতে: কলকাতা থেকে কোলাঘাট হয়ে তমলুক যেতে সময় লাগে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা।

Google Maps

Scroll to Top