জুনপুট
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার একটি শান্ত এবং মনোরম সমুদ্র সৈকত হলো জুনপুট। যারা দীঘা বা মন্দারমণির ভিড় এড়িয়ে নির্জনে সমুদ্রের সান্নিধ্য পেতে চান, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ গন্তব্য।
প্রধান আকর্ষণসমূহ
জুনপুটের সমুদ্র সৈকত বেশ প্রশস্ত এবং এখানে ঝাউবনের আধিক্য দেখা যায়। জোয়ারের সময় সমুদ্র কাছে এলেও ভাটার সময় জল অনেকটা দূরে সরে যায়।
১. জুনপুট সমুদ্র সৈকত (Junput Sea Beach)
জুনপুটের মূল আকর্ষণ হলো এর শান্ত এবং নির্জন সমুদ্র সৈকত। ঝাউগাছের সারি আর লাল কাঁকড়াদের অবাধ বিচরণ এই সৈকতকে এক অনন্য রূপ দেয়। এটি মূলত একটি অমসৃণ সৈকত, যেখানে পর্যটকদের ভিড় খুব কম থাকে। সূর্যাস্তের সময় সমুদ্রের আকাশ এক অপূর্ব রঙ ধারণ করে, যা ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ।
২. কপালকুণ্ডলা মন্দির (Kapalkundala Temple)
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে এই মন্দিরটি সারা বাংলায় পরিচিত।
বিশেষত্ব: জনশ্রুতি আছে যে, বঙ্কিমচন্দ্র এই এলাকা ভ্রমণের সময়ই উপন্যাসের প্রেরণা পেয়েছিলেন। উপন্যাসের সেই তান্ত্রিক (কাপালিক) যে মন্দিরে সাধনা করতেন, এটি সেই স্থান বলেই মনে করা হয়।
অবস্থান: জুনপুট থেকে প্রায় ৮-৯ কিমি দূরে দরিয়াপুরে অবস্থিত।
৩. দরিয়াপুর লাইটহাউস (Dariapur Lighthouse)
উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম উচ্চতম এবং আকর্ষণীয় বাতিঘর এটি। প্রায় ৩০ মিটার উঁচু এই বাতিঘরটি ১৯৬৪ সালে নির্মিত হয়েছিল।
কেন যাবেন: এর ওপর থেকে বঙ্গোপসাগর এবং চারপাশের ম্যানগ্রোভ ও ঝাউবনের এক বিশাল প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়।
সময়সূচী: এটি সাধারণত প্রতিদিন বিকেল ৩টে থেকে ৫টা পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে। অল্প প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে ওপরে ওঠার অনুমতি পাওয়া যায়।
৪. পেটুয়াঘাট মৎস্য বন্দর (Petuaghat Fishing Harbour)
এটি ভারতের সপ্তম বৃহত্তম এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম আধুনিক মৎস্য বন্দর। রসুলপুর নদীর মোহনায় এটি অবস্থিত।
আকর্ষণ: শত শত রঙিন মাছ ধরার ট্রলার যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য তৈরি হয়। সকালে গেলে দেখা যায় কীভাবে গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলারগুলো টন টন টাটকা মাছ নিয়ে ফিরে আসে। এখানে একটি বড় মাছের বাজারও বসে।
৫. মৎস্য চাষ গবেষণা কেন্দ্র (Brackish Water Fish Farm)
রাজ্য মৎস্য দপ্তরের অধীনে জুনপুটে নোনা জলের মাছের ওপর একটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এখানে নোনা জলে মাছ চাষের আধুনিক পদ্ধতি এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিজ্ঞান ও প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এটি একটি বিশেষ দর্শনীয় স্থান।
৬. হিজলি শরীফ (Hijli Sharif)
কাঁথির কাছে অবস্থিত এই স্থানটি একটি পবিত্র দরগাহ হিসেবে পরিচিত। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক, যেখানে বহু মানুষ মানত করতে আসেন। এখানকার শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের ভালো লাগবে।
৭. বাঁকিপুট (Bankiput)
জুনপুটের খুব কাছেই অবস্থিত আর একটি অফবিট সৈকত হলো বাঁকিপুট। এখানকার সমুদ্রের বাঁধ বা ‘ডাইক’ (Dyke) থেকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখার অভিজ্ঞতা দারুণ। নির্জনে সমুদ্রের গর্জন শুনতে চাইলে এখানে অবশ্যই একবার ঘুরে আসবেন।
থাকার ব্যবস্থা
জুনপুটে থাকার জন্য খুব বেশি লাক্সারি রিসোর্ট নেই, তবে আরামদায়ক থাকার জায়গা পাওয়া যায়:
জুনপুট রিসোর্ট: এটি এখানকার সবচেয়ে পরিচিত এবং পুরোনো থাকার জায়গা।
পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য দপ্তরের বাংলো: এখানে থাকার জন্য আগে থেকে বুকিং করা প্রয়োজন।
এছাড়া ইদানীং কিছু ছোট হোমস্টে এবং লজ তৈরি হয়েছে।
খাওয়া-দাওয়া
জুনপুট মূলত টাটকা সামুদ্রিক মাছের জন্য বিখ্যাত। এখানে বিভিন্ন ধরণের মাছ যেমন—পমফ্রেট, পারশে, বাগদা চিংড়ি এবং ইলিশ পাওয়া যায়। স্থানীয় হোটেলগুলোতে বাঙালি থালি বেশ জনপ্রিয়।
ভ্রমণের সেরা সময়
জুনপুট ভ্রমণের সেরা সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। শীতকালে আবহাওয়া খুব মনোরম থাকে। বর্ষাকালে সমুদ্রের রূপ অন্যরকম হলেও যাতায়াতে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে।
টিপস: জুনপুটে কেনাকাটার তেমন বড় বাজার নেই, তাই প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখা ভালো। আর বাতিঘর দেখার পরিকল্পনা থাকলে বিকেলের নির্দিষ্ট সময়ের (সাধারণত ৩টে থেকে ৫টা) মধ্যে পৌঁছানো জরুরি।
কিভাবে এখানে আসবেন
কলকাতা থেকে জুনপুটের দূরত্ব প্রায় ১৬০ কিমি।
ট্রেনে: হাওড়া বা শালিমার থেকে দীঘাগামী যেকোনো ট্রেনে উঠে কাঁথি (Contai) স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে অটো বা টোটো করে জুনপুট পৌঁছানো যায় (দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিমি)।
বাসে: ধর্মতলা বা দিঘা রুটের বাসে উঠে কাঁথি মোড়ে নামতে হবে। সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনে জুনপুট যাওয়া সহজ।
গাড়িতে: কলকাতা থেকে কোলাঘাট, নন্দকুমার হয়ে কাঁথি এবং সেখান থেকে জুনপুট। সময় লাগে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা।
