সিটং
পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলার এক শান্ত, সবুজ এবং অপরূপ সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম সিটং (Sittong)। পাহাড়ি উপত্যকা জুড়ে থাকা কমলালেবুর বাগানের জন্য একে ভালোবেসে “কমলালেবুর দেশ” বা ‘Orange Village‘ বলা হয়। কাঞ্চনজঙ্ঘার কোল ঘেঁষে থাকা এই অফবিট ডেস্টিনেশনটি শহুরে কোলাহল থেকে দূরে কয়েকটা দিন কাটানোর জন্য আদর্শ।
কখন যাবেন (Best Time to Visit)
নভেম্বর থেকে জানুয়ারি (সেরা সময়): এই সময়েই সিটং-এর আসল রূপ দেখা যায়। পুরো গ্রাম কমলার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে, গাছে গাছে থোকা থোকা কমলালেবু ঝুলে থাকে। তাছাড়া আকাশ একদম পরিষ্কার থাকায় কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
মার্চ থেকে মে: পাহাড়ি ফুল, সবুজের সমারোহ এবং মনোরম আবহাওয়ার জন্য এই সময়েও যাওয়া যায়। সমতলের গরম থেকে বাঁচতে এটি চমৎকার সময়।
সতর্কতা: বর্ষাকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) পাহাড়ে ধস নামার ঝুঁকি থাকে, তাই এই সময়টা এড়িয়ে চলাই ভালো।
সিটং ও তার চারপাশের দর্শনীয় স্থান (Sightseeing)
সিটং মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত— আপার (Upper), মিডল (Middle) এবং লোয়ার (Lower) সিটং। পুরো এলাকা এবং তার আশেপাশে ঘুরে দেখার মতো দারুণ সব জায়গা রয়েছে:
কমলালেবুর বাগান (Orange Orchards): শীতকালে গেলে চাষীদের সাথে কথা বলে বাগান ঘুরে দেখার এবং টাটকা লেবুর স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতা দারুণ।
অহলদারা ভিউ পয়েন্ট (Ahaldara View Point): সিটং থেকে কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত এই জায়গা থেকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে কাঞ্চনজঙ্ঘা, তিস্তা নদী এবং সিঙ্কোনা পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায়। এখানকার সূর্যোদয় মিস করার মতো নয়।
মংপু (Mungpoo): সিটং থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। এখানে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত রবীন্দ্র ভবন (মিউজিয়াম)। এছাড়া মংপুর সিঙ্কোনা চাষ ও প্রসেসিং ফ্যাক্টরিও দেখার মতো।
নামথিং পোখরি (Namthing Pokhri): এটি একটি প্রাকৃতিক হ্রদ, যা অত্যন্ত বিরল প্রজাতির হিমালয়ান স্যালামান্ডার (Himalayan Salamander) -এর জন্য বিখ্যাত।
সিটং চার্চ (Sittong Church): বাঁশ ও কাঠের তৈরি একটি অত্যন্ত পুরোনো এবং শান্ত গির্জা, যেখান থেকে চারপাশের পাহাড়ি উপত্যকার চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়।
রিয়াং নদী (Riyang River) ও যোগীকুল: লোয়ার সিটং-এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি নদী রিয়াং-এর পাথুরে তীরে বসে সময় কাটানো বেশ রোমাঞ্চকর।
কোথায় থাকবেন ও খাওয়া-দাওয়া (Accommodation & Food)
সিটং-এ কোনো বড় বা বিলাসবহুল হোটেল নেই। এখানে থাকার মূল আকর্ষণ হলো স্থানীয় লেপচা ও নেপালি পরিবারের দ্বারা পরিচালিত হোমস্টে (Homestay)।
আতিথেয়তা: হোমস্টের মানুষজনের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। জানলা খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা বা সবুজ উপত্যকা দেখা যায়— এমন অনেক সুন্দর হোমস্টে রয়েছে।
খরচ: সাধারণত থাকা এবং খাওয়া (সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, সন্ধ্যার স্ন্যাক্স ও রাতের খাবার) মিলিয়ে জনপ্রতি প্রতিদিন ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
খাবার: একদম ঘরোয়া উপায়ে তৈরি গরম ভাত, ডাল, স্থানীয় বাগানের টাটকা সবজি, ডিম বা মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়। এছাড়া পাহাড়ের লোকাল মোমো বা থুকপা চেখে দেখতে পারেন।
৩ দিন ২ রাতের একটি আদর্শ ট্যুর প্ল্যান (Itinerary)
দিন ১: এনজেপি বা বাগডোগরা থেকে সকালে রওনা হয়ে দুপুরের মধ্যে সিটং-এর হোমস্টেতে পৌঁছানো। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকেলের দিকে স্থানীয় চার্চ এবং গ্রামের পাহাড়ি পথ ধরে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো।
দিন ২: খুব ভোরে গাড়ি নিয়ে চলে যান অহলদারা ভিউ পয়েন্টে সূর্যোদয় দেখতে। সেখান থেকে ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়ুন সাইটসিয়িং-এর জন্য— মংপু (রবীন্দ্র ভবন), নামথিং পোখরি এবং সিটং-এর কমলালেবুর বাগান ঘুরে দেখা। সন্ধ্যায় হোমস্টেতে পাহাড়ি চায়ের সাথে আড্ডা।
দিন ৩: সকালে জলখাবার খেয়ে লোয়ার সিটং-এর রিয়াং নদীর রূপ দেখে এনজেপি বা আপনার পরবর্তী গন্তব্যের (যেমন দার্জিলিং, কালিম্পং বা চাতকপুর) উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া।
কিছু জরুরি টিপস ও সতর্কতা
1. ক্যাশ বা নগদ টাকা: সিটং-এ কোনো এটিএম (ATM) সুবিধা নেই এবং নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সব সময় অনলাইন পেমেন্ট নাও কাজ করতে পারে। তাই শিলিগুড়ি বা এনজেপি থেকেই পর্যাপ্ত ক্যাশ টাকা সাথে নিয়ে নিন।
2. পোশাক: পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যার পর বেশ ঠান্ডা পড়ে। শীতকালে গেলে ভালো ভারী উলের পোশাক, গ্লাভস ও থার্মাল ইনার সাথে রাখবেন। অন্য ঋতুতে গেলেও হালকা জ্যাকেট বা চাদর রাখা দরকার।
3. ওষুধ ও ফার্স্ট এইড: পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় অনেকের বমি বা মাথা ঘোরার সমস্যা হয়, তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফার্স্ট এইড কিট সাথে রাখুন।
4. পরিবেশ সচেতনতা: পাহাড়ের শান্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখুন। প্লাস্টিকের বোতল বা আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।
কিভাবে এখানে আসবেন
শিলিগুড়ি, এনজেপি (NJP) বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে সিটং-এর দূরত্ব প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার। যাওয়ার মূলত তিনটি রুট আছে:
1. সেভক-কালিজোড়া রুট: এনজেপি থেকে তিস্তা নদী পার হয়ে কালিজোড়া হয়ে সিটং যাওয়া যায়। এই রুটটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও সুন্দর।
2. কার্শিয়াং-দিলরাম রুট: এনজেপি থেকে কার্শিয়াং হয়ে দিলরাম, সেখান থেকে রিনচিংটং হয়ে সিটং।
3. মংপু রুট: শিলিগুড়ি থেকে মংপু হয়েও সিটং পৌঁছানো যায়।
গাড়ির খরচ: এনজেপি বা শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি গাড়ি (Innova, Bolero, Sumo ইত্যাদি) রিজার্ভ করলে গাড়ির ধরন অনুযায়ী ৩,৫০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা (ঋতুভেদে কম-বেশি হতে পারে) খরচ পড়বে। পাহাড়ে যাতায়াতের জন্য আগে থেকে নির্ভরযোগ্য গাড়ি বুক করে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
