গহিরমাথা সমুদ্র সৈকত

পশ্চিমবঙ্গের খুব কাছেই, ওড়িশার কেন্দ্রাপড়া জেলায় অবস্থিত গহিরমাথা সমুদ্র সৈকত (Gahirmatha Beach) প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এবং বন্যপ্রাণী উৎসাহীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। এটি বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা কেবল একটি সাধারণ সৈকত নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম অলিভ রিডলে কাছিম (Olive Ridley Sea Turtles)-এর প্রজনন ক্ষেত্র এবং ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অভয়ারণ্য।

গহিরমাথার মূল আকর্ষণ ও দর্শনীয় স্থান:

অলিভ রিডলে কাছিমের মেলা (Mass Nesting): গহিরমাথার মূল খ্যাতি এর কাছিমদের নিয়ে। প্রতি বছর শীতের শেষে (সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে) প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে লাখ লাখ মা কাছিম ডিম পাড়ার জন্য এই সৈকতে দল বেঁধে আসে। এই ঘটনাকে ওড়িয়া ভাষায় ‘আরিবাদা’ (Arribada) বলা হয়।

ভিতরকনিকা জাতীয় উদ্যান (Bhitarkanika National Park): গহিরমাথা মেরিন স্যাঙ্কচুয়ারি আসলে বিখ্যাত ভিতরকনিকা ন্যাশনাল পার্কেরই একটি অংশ। এখানকার সুবিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অরণ্য, খাঁড়ি এবং নদীগুলোতে ভেসে বেড়ানো বিশাল আকৃতির লোনা জলের কুমির (Saltwater Crocodiles) দেখার অভিজ্ঞতা দারুণ।

একাকী শান্ত সৈকত: দিঘা বা পুরীর মতো এখানে পর্যটকদের চিল চিৎকার বা বাণিজ্যিক কোলাহল নেই। জনমানবহীন, শান্ত এবং আদিম প্রকৃতির এক অপরূপ রূপ দেখা যায় এখানে। পাখির কলতান আর সমুদ্রের গর্জন ছাড়া এখানে আর কোনো শব্দ নেই।

ভ্রমণের সেরা সময়

গহিরমাথা ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ মাস।

 * এই সময়ে এখানকার আবহাওয়া খুব মনোরম থাকে।

 * যদি আপনি কাছিমদের ডিম পাড়া বা ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে সমুদ্রের দিকে যাওয়ার অলৌকিক দৃশ্য দেখতে চান, তবে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে যাওয়া সবচেয়ে ভালো।

জরুরি সতর্কতা: কাছিমদের প্রজনন ও সুরক্ষার জন্য বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত ১ নভেম্বর থেকে ৩১ মে) মূল সৈকতে সাধারণ মানুষের প্রবেশে বনবিভাগের কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে আপনি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বিশেষ অনুমতি নিয়ে বা দূর থেকে অনুমোদিত বোটের মাধ্যমে এই অভয়ারণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

থাকার ব্যবস্থা (Accommodation)

গহিরমাথা সমুদ্র সৈকতে সরাসরি থাকার কোনো হোটেল, রিসোর্ট বা হোমস্টে নেই। থাকার জন্য আপনাকে ভিতরকনিকা বা তার আশেপাশের এলাকায় ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারি ইকো-কটেজ (Forest Eco-Tourism): ভিতরকনিকার ডাঙ্গমাল (Dangamal) এবং গুপ্তি (Gupti)-তে ওড়িশা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের চমৎকার কটেজ ও টেন্ট রয়েছে। জঙ্গল ও প্রকৃতির মাঝে থাকার জন্য এটি সেরা বিকল্প। ওড়িশা ইকো-ট্যুরিজমের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে এটি আগে থেকে বুক করে যাওয়া বাধ্যতামূলক।

বেসরকারি লজ: চাঁদবালি এবং রাজনগরে কিছু মাঝারি মানের বেসরকারি হোটেল ও লজ পেয়ে যাবেন, যা বেশ বাজেট-ফ্রেন্ডলি।

ভ্রমণ টিপস ও কিছু জরুরি নিয়মাবলী

১. এন্ট্রি পারমিট: গহিরমাথা মেরিন স্যাঙ্কচুয়ারি এবং ভিতরকনিকা অঞ্চলে প্রবেশের জন্য বনবিভাগের (Forest Department) অনুমতিপত্র বা পারমিট নিতে হয়, যা আপনি গুপ্তি বা খলা (Khola) চেকপোস্ট থেকে পেয়ে যাবেন।

২. নগদ টাকা রাখুন: এটি একটি প্রত্যন্ত জঙ্গল ও উপকূলীয় অঞ্চল। এখানে এটিএম-এর সংখ্যা খুবই সীমিত এবং অনেক সময় নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে অনলাইন পেমেন্ট বা ইউপিআই (UPI) কাজ নাও করতে পারে। তাই পর্যাপ্ত ক্যাশ টাকা সাথে রাখুন।

৩. পরিবেশ সচেতনতা: প্লাস্টিক, থার্মোকল বা কোনো ধরণের আবর্জনা সৈকতে বা নদীতে ফেলবেন না।

৪. কাছিম দেখার নিয়ম: কাছিমদের প্রজনন কালীন সময়ে ছবি তোলার জন্য ফ্লাশ লাইট বা কোনো তীব্র আলো ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাতের বেলা সৈকতে টর্চ জ্বালানো নিষেধ, কারণ আলো দেখলে কাছিমেরা ভয় পেয়ে যায় এবং দিকভ্রান্ত হয়।

গহিরমাথার এই আদিম রূপ এবং বন্যপ্রাণের সান্নিধ্য আপনার ভ্রমণ ডায়েরিতে এক চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

কিভাবে এখানে আসবেন

গহিরমাথা মূল ভূখণ্ডের সাথে সরাসরি সড়কপথে যুক্ত নয়। এখানে পৌঁছানোর জন্য জলপথের সাহায্য নিতেই হবে। কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়ার রুটটি নিচে দেওয়া হলো:

ধাপ ১ (ট্রেনে বা গাড়িতে): হাওড়া বা শালিমার থেকে ট্রেনে এসে ওড়িশার ভদ্রক (Bhadrak) অথবা কটক (Cuttack) স্টেশনে নামুন। ভদ্রক থেকে সড়কপথে গাড়িতে বা বাসে চলে আসুন চাঁদবালি (Chandbali) (দূরত্ব প্রায় ৫০ কিমি)। কটক থেকে আসলে আসতে হবে রাজনগর (Rajnagar) হয়ে।

ধাপ ২ (জলপথে মূল যাত্রা): চাঁদবালি, রাজনগর অথবা গুপ্তি (Gupti) ঘাট থেকে বনবিভাগের লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোটরচালিত বোট বা লঞ্চ ভাড়া করতে হবে। এই বোটগুলো নদী ও খাঁড়ি পেরিয়ে আপনাকে ভিতরকনিকা অভয়ারণ্য এবং গহিরমাথা উপকূলের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। এই নদীপথের যাত্রাটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর, যেখানে নদীর চরে রোদ পোহানো বিশাল বিশাল কুমির দেখতে পাওয়া যায়।

Google Maps

Scroll to Top