মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার

পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন হলো মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার (শ্রীবন্দক মহাবিহার)। এটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতন-১ নম্বর ব্লকে অবস্থিত এবং এটি প্রাচীন বাংলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীনতম বৌদ্ধ বিহার কমপ্লেক্স।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও গুরুত্ব

সময়কাল: এটি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর (গুপ্ত-উত্তর ও পাল যুগ) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র।

নামকরণ: স্থানীয়ভাবে স্থানটি “সখিসেনের ঢিপি” বা “শশীসেনের পাঠশালা” নামে দীর্ঘদিন পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে উৎখননে প্রাপ্ত পোড়ামাটির সিলমোহর থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এর প্রাচীন নাম ছিল “শ্রীবন্দকমহাবিহার”।

খননকার্য: ২০০২-০৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. অশোক দত্তের নেতৃত্বে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক খননকার্য শুরু হয় এবং একাধিক ধাপে বৃহৎ এই স্থাপত্যটি উন্মোচিত হয়।

ঐতিহাসিক যোগসূত্র: সপ্তম শতকে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের (Xuanzang) ভ্রমণবৃত্তান্তে তাম্রলিপ্ত অঞ্চলের কাছে যে সমৃদ্ধ বৌদ্ধ বিহারগুলির উল্লেখ ছিল, এটি তারই অন্যতম বলে মনে করা হয়।

প্রধান দর্শনীয় বিষয়

১. মূল মহাবিহার বা কেন্দ্রীয় মন্দির কাঠামো

স্থাপত্যশৈলী: খননকার্যের ফলে উন্মোচিত এই বিশাল লাল ইটের কাঠামোটি মূলত একটি ত্রিরথ (Tri-ratha) পরিকল্পনার ওপর নির্মিত। বিহারের মাঝখানে রয়েছে একটি বিশাল বর্গাকার উঠোন (Central Courtyard), যাকে কেন্দ্র করে চারদিকে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত হয়েছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বসবাসের কক্ষ (Monks’ Cells)।

প্রদক্ষিণ পথ: মূল মন্দিরের পূর্ব ও দক্ষিণ অংশে চওড়া ইটের তৈরি ‘প্রদক্ষিণ পথ’ (Pradakshina Path) রয়েছে, যেখানে ভক্তরা ঘুরে ঘুরে পুজো বা উপাসনা করতেন।

২. দেওয়ালের চমৎকার স্টুকো (Stucco) আর্ট

মোগলমারির প্রধানতম স্বতন্ত্র সৌন্দর্য হলো এর দেওয়ালের ওপর চুনাপাথর ও জিপসামের প্রলেপ দিয়ে তৈরি স্টুকো ভাস্কর্য (গৌড় ও নালন্দা শৈলীর সংমিশ্রণ)।

নকশা ও প্লাস্টার: বিহারের বাইরের মূল দেওয়ালে দেখা যায় পদ্মফুল, নানাবিধ লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা এবং সিংহ ও অন্যান্য পশুর প্রতিরূপ।

মূর্তি: দেওয়ালের কুলুঙ্গিগুলোতে বুদ্ধদেব, বোধিসত্ত্ব এবং বাজ্রযান বৌদ্ধধর্মের দেব-দেবীর (যেমন: জাম্বালা, সরস্বতী বা জাঙ্গুলী) মূর্তি প্লাস্টারের সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।

৩. আলংকারিক ইট (Decorative Bricks)

মোগলমারির নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইটের বিচিত্রতা প্রাচীন কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় দেয়।

প্রাচীন এই বিহারটির বাইরের দেওয়াল সাজাতে প্রায় ৪৫ প্রকারের ভিন্ন ভিন্ন অলঙ্কৃত বা নকশাদার ইট ব্যবহার করা হয়েছিল।

প্রতিটি ইটে খাঁজকাটা ফুল, ধানের শিষ, বা জ্যামিতিক ছাঁচ খোদাই করা ছিল, যা নালন্দা মহাবিহারের ইটের অলঙ্করণের সাথে বহুলাংশে মিলে যায়।

৪. ভোটিভ স্তূপ (Votive Stupas)

বিহার কমপ্লেক্সের চারপাশে এবং দ্বিতীয় সাইট অংশে (MGM-2) বেশ কিছু গোলাকার ছোট-বড় ইটের স্তূপ বা ‘ভোটিভ স্তূপ’ উদ্ধার করা হয়েছে।

তীর্থযাত্রী বা ভিক্ষুরা তাঁদের মানত বা শ্রদ্ধার চিহ্ন হিসেবে এই ছোট স্তূপগুলো প্রতিষ্ঠা করতেন।

৫. স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা (Site Museum & Exhibition Centre)

উৎখননের পর প্রাপ্ত মহামূল্যবান প্রত্নবস্তুগুলোকে সংরক্ষণ করে জনসাধারণের জন্য দেখার সুব্যবস্থা করা হয়েছে কাছেই অবস্থিত অস্থায়ী সংগ্রহশালা বা প্রদর্শনী

কেন্দ্রে:

ব্রোঞ্জ ও পাথরের মূর্তি: এখান থেকে ৪০টিরও বেশি ব্রোঞ্জের বুদ্ধ মূর্তি, অবলোকিতেশ্বর, লোকেশ্বর এবং স্লেট পাথরের তৈরি প্রাচীন বুদ্ধ বিগ্রহ উদ্ধার হয়েছে, যা এই সংগ্রহশালায় সুরক্ষিত।

পোড়ামাটির সিলমোহর (Seals): গুপ্ত-উত্তর ব্রাহ্মী এবং প্রাক্-বাংলা হরফে লিখিত একাধিক পোড়ামাটির সিলমোহর রয়েছে। এর মাধ্যমেই স্থানটির প্রকৃত প্রাচীন নাম “শ্রীবন্দক মহাবিহার” বা “শ্রীবর্মা” বলে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

মুদ্রা ও অন্যান্য: গুপ্ত রাজাদের আমলের বিরল স্বর্ণমুদ্রা (যেমন রাজা সমাচারদেবের আমলের মুদ্রা), তাম্র মুদ্রা, পোড়ামাটির প্রদীপ, অলঙ্কার এবং মৃৎপাত্রের অংশবিশেষ এখানে রাখা আছে।

ভ্রমণ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য

ভ্রমণের সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ (শীতকাল)। খোলা আকাশের নিচে হেঁটে ঘুরে দেখার জন্য এই সময়টি সবচেয়ে আরামদায়ক।

সময়সূচী: পুরো বিহার ও স্থানীয় মিউজিয়ামটি ভালোভাবে ঘুরে দেখতে আনুমানিক ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে।

থাকা ও খাওয়া: মোগলমারি গ্রামে থাকার জন্য বড় কোনো হোটেল নেই। এটি মূলত একদিনের ট্রিপ (Day Trip) হিসেবে উপযুক্ত। রাতে থাকতে চাইলে নিকটবর্তী

খড়গপুর বা মেদিনীপুর শহরে হোটেল নেওয়াই শ্রেয়। স্থানীয় ছোট দোকানে চা ও হালকা জলখাবার পাওয়া যায়।

কিভাবে এখানে আসবেন

রেলপথে:

   * নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হলো নেকুরসেনি (Nekurseni) বা দাঁতন (Dantan)।

   * হাওড়া থেকে খড়গপুর বা বালেশ্বরগামী ট্রেনে এসে নেকুরসেনি বা দাঁতন স্টেশনে নেমে টোটো অথবা অটো নিয়ে সরাসরি বিহারে পৌঁছানো যায়।

 সড়কপথে:

   * কলকাতা বা খড়গপুর থেকে জাতীয় সড়ক NH-60 (বর্তমান ১৬ নম্বর জাতীয় সড়ক) ধরে ওড়িশাগামী পথে দাঁতনের কাছে মোগলমারি মোড়ে নামতে হয়। খড়গপুর শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০-৪৫ কিমি।

 বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর হলো কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

Google Maps

Scroll to Top