গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক

মেদিনীপুর জেলার অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হলো গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার ইকো-ট্যুরিজম পার্ক। কংসাবতী নদীর তীর ঘেঁষে লাল মাটির উঁচু টিলার ওপর গড়ে ওঠা এই পার্কটি ইতিহাস, ঘন বনভূমি এবং শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

ইতিহাস ও পৌরাণিক ব্যাকগ্রাউন্ড

পৌরাণিক কথা: স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মহাভারতের যুগে মৎস্যদেশের রাজা বিরাটের গোশালা বা ‘গোগৃহ’ ছিল এই গোপগড়ে। অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবরা কিছুকাল এখানে লুকিয়ে অবস্থান করেছিলেন বলেও বিশ্বাস করা হয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: চতুর্দশ শতকে এই অঞ্চলে গোপ রাজাদের রাজত্ব ছিল। রাজা গোপাল এই দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এবং তারও পরে এই এলাকা পরিত্যক্ত হলেও স্থানীয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকে।

হেরিটেজ পার্ক রূপায়ন: ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বন দপ্তরের উদ্যোগে প্রায় ৩৫ হেক্টর বনভূমি নিয়ে এটিকে ‘ইকো-ট্যুরিজম পার্ক’ হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং ২০০৬ সালে এটি হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষিত হয়।

গোপগড়ের মূল আকর্ষণসমূহ

১. ঐতিহাসিক দুর্গের ভগ্নাবশেষ ও হেরিটেজ ভবন

গোপগড়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। পার্কের ভেতরে হেঁটে বেড়ালে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের প্রাচীন রাজবাড়ি বা গোপ রাজাদের তৈরি দুর্গের ইট ও সুরকি দিয়ে নির্মিত কিছু ভগ্নস্তূপ চোখে পড়ে। এর আশেপাশে রয়েছে ব্রিটিশ আমলে তৈরি একটি লাল ইটের হেরিটেজ বাংলো। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এই পরিত্যক্ত কাঠামো ও প্রাচীন স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক Gopegarh Heritage & Nature Eco-Tourism Centre গোপগড় হেরিটেজ এণ্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম্ সেন্টার
গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক Gopegarh Heritage & Nature Eco-Tourism Centre গোপগড় হেরিটেজ এণ্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম্ সেন্টার

২. উঁচুতে অবস্থিত ওয়াচ টাওয়ার (Watch Tower)

পার্কের উচ্চতম স্থানে একটি মজবুত ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে। টাওয়ারে উঠলে চারপাশের এক অসাধারণ প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়:

বনভূমির বিস্তার: নিচে ঘন শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি ও কংসাবতী নদীর তীরবর্তী শালবনের এক বিশাল সবুজ চাদর বিছানো রয়েছে বলে মনে হয়।

কংসাবতী নদী ও সেতু: মেদিনীপুরের বিখ্যাত কংসাবতী (কাংসাই) নদী এবং তার ওপর গড়ে ওঠা উড়ালপুলের দৃশ্য এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।

সূর্যাস্ত দর্শন: বিকেলবেলায় এই ওয়াচ টাওয়ার থেকে কংসাবতীর বুকে সূর্যাস্তের দৃশ্য দারুণ লাগে।

৩. সোনাঝুরি ও শাল গাছের গভীর বনবীথি

পার্কটি প্রায় ৩৫ হেক্টর লাল মাটির পাহাড়ি টিলা এলাকার ওপর বিস্তৃত। এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লাল মাটির মেঠো পথ এবং তার দু’পাশে লম্বা শাল, সেগুন ও সোনাঝুরি গাছের শৃঙ্খলিত সারি। রোদের আলো যখন সোনাঝুরি পাতার মধ্য দিয়ে লাল মাটিতে এসে পড়ে, তখন এক অপূর্ব আলোক-ছায়ার খেলা তৈরি হয়। শান্ত পরিবেশে পাখির ডাক শুনতে শুনতে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই বনবীথি অনন্য।

৪. সুসজ্জিত পুষ্পোদ্যাক ও ঝাউ বীথি

প্রাকৃতিক বনের পাশাপাশি পার্কটির একটি অংশ কৃত্রিমভাবে অত্যন্ত সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মরসুমি রকমারি ফুল (বিশেষ করে শীতকালে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাদা ইত্যাদি), সুন্দর করে ছাঁটা ঝাউ গাছ এবং কৃত্রিম ছোট ছোট ঝরনা ও ফোয়ারা পার্কের সৌন্দর্য অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

৫. চিলড্রেন পার্ক ও বিনোদন এলাকা

পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য এটি একটি বড় আকর্ষণ। শিশুদের বিনোদনের জন্য আলাদা একটি সুরক্ষিত স্থান রয়েছে যেখানে দোলনা, স্লিপ, সি-স (See-saw) এবং অন্যান্য বিভিন্ন খেলার সরঞ্জাম বসানো আছে।

৬. প্রাকৃতিক পরিবেশের পিকনিক স্পট

শীতকালে পরিবার বা বন্ধুদের দল নিয়ে আনন্দ করার জন্য গোপগড় অত্যন্ত জনপ্রিয়। পার্কের ভেতরে বিশাল খোলা মাঠ এবং ছায়াঘেরা অঞ্চল রয়েছে যেখানে রান্নার জল, বসার শেড এবং নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা রয়েছে। বনের গাছের নিচে লাল মাটিতে বসে খোলামেলা পরিবেশে পিকনিক করার অভিজ্ঞতা বেশ উপভোগ্য।

গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক Gopegarh Heritage & Nature Eco-Tourism Centre গোপগড় হেরিটেজ এণ্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম্ সেন্টার
গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক Gopegarh Heritage & Nature Eco-Tourism Centre গোপগড় হেরিটেজ এণ্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম্ সেন্টার

৭. ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের কটেজ

যারা প্রকৃতি ও নিস্তব্ধতার মধ্যে এক বা দুই রাত কাটাতে চান, তাদের জন্য পার্কের ভেতরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বন উন্নয়ন নিগমের (WBFDC) তৈরি কাঠের কটেজ রয়েছে। চারপাশে বনভূমি আর রাতে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতার মধ্যে থাকার অভিজ্ঞতা অ্যাডভেঞ্চার ও প্রকৃতির সান্নিধ্যপ্রত্যাশীদের কাছে প্রধান আকর্ষণ।

প্রয়োজনীয় তথ্য ও খরচ

সময়সূচী: পার্কটি সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৮:০০ টা থেকে বিকেল ৫:৩০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

প্রবেশ মূল্য: প্রতি জন সাধারণ টিকিট ১০ টাকা (৬ বছরের নিচে শিশুদের প্রবেশ নিখরচায়)।

পার্কিং ফি: টু-হুইলার ও চার চাকার গাড়ির জন্য নির্ধারিত পার্কিং ফি রয়েছে (গড় ২০-৫০ টাকা)।

কিছু জরুরি ভ্রমণ পরামর্শ

সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ (শীতকাল) ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

খাবার ও পানীয়: পার্কের বাইরে ও ভেতরে ছোট দোকান রয়েছে, তবে পিকনিক না করলে সারাদিন কাটানোর জন্য সাথে কিছুটা শুকনো খাবার ও পানীয় জল রাখা ভালো।

রাত্রিবাস: আপনি যদি রাতে থাকতে চান, তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বন উন্নয়ন নিগমের (WBFDC) মাধ্যমে পার্কের কটেজে আগে থেকে অনলাইন বুকিং করে আসতে হবে। নতুবা মেদিনীপুর শহরেই থাকার মতো পর্যাপ্ত হোটেল ও হোমস্টে রয়েছে।

গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক Gopegarh Heritage & Nature Eco-Tourism Centre গোপগড় হেরিটেজ এণ্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম্ সেন্টার
গোপগড় হেরিটেজ ও নেচার পার্ক Gopegarh Heritage & Nature Eco-Tourism Centre গোপগড় হেরিটেজ এণ্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম্ সেন্টার

কিভাবে এখানে আসবেন

ট্রেনে: হাওড়া স্টেশন থেকে মেদিনীপুরগামী যেকোনো লোকাল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে (যেমন রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস, শিরোমণি প্যাসেঞ্জার) উঠে মেদিনীপুর স্টেশনে নামতে হবে। স্টেশন থেকে গোপগড় নেচার পার্কের দূরত্ব প্রায় ৪ কিমি। স্টেশন বাইরে থেকে টোটো, অটো বা ট্যাক্সি নিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটে সহজে পৌঁছানো যায়।

সড়কপথে: কলকাতা থেকে ৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে কোলাঘাট ও খড়গপুর হয়ে মেদিনীপুর শহরে প্রবেশ করতে হবে। মেদিনীপুর শহর থেকে ধেড়ুয়া রোড ধরে মাত্র ২.৫ কিমি এগোলেই গোপগড় পার্কের প্রধান ফটক চোখে পড়বে।

Google Maps

Scroll to Top