পাথরা
পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় কংসাবতী (কাংসাই) নদীর তীরে অবস্থিত পাথরা বা ‘মন্দিরময় পাথরা’ প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য ঠিকানা। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI)-এর অধীনে থাকা এই গ্রামটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৪টি প্রাচীন পোড়ামাটির (টেরাকোটা) ও পাথরের মন্দির রয়েছে।
একদিন বা দু’দিনের ছোট্ট ভ্রমণের (Weekend Trip) জন্য পাথরা একটি দারুণ জায়গা।
কী কী দেখবেন?
‘মন্দিরময় পাথরা’র স্থাপত্যগুলো মূলত ৩-৪টি প্রধান ক্লাস্টার বা ভাগে বিভক্ত। ইতিহাস, স্থাপত্যরীতি ও টেরাকোটার চমৎকার কারুকাজের দিক থেকে এখানকার প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নবরত্ন মন্দির কমপ্লেক্স (Majumdar Family Complex)
বর্ণনা: এটি পাথরার অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় স্থাপত্য। কংসাবতী নদীর তীর ঘেঁষে এটি অবস্থিত।
বৈশিষ্ট্য: প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এই মন্দিরটিতে নয়টি চূড়া রয়েছে। প্রাচীন মেদিনীপুরের মজুমদার পরিবারের তৈরি এই নবরত্ন মন্দিরের গায়ে অপূর্ব টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক লাগানো রয়েছে।
অন্যান্য নির্মাণ: এই কমপ্লেক্সের ভেতরে নবরত্ন মন্দিরের পাশাপাশি একটি আটচালা শিব মন্দির এবং কয়েকটি সমতল ছাদের প্রাচীন মন্দিরও রয়েছে।
২. কালাচাঁদ মন্দির কমপ্লেক্স (Kalachand Temple Complex)
বর্ণনা: মেদিনীপুর শহর থেকে গ্রামে ঢোকার মূল রাস্তার বাঁ দিকে এই কমপ্লেক্সটি অবস্থিত।
বৈশিষ্ট্য: এখানে ইট দিয়ে তৈরি আয়তাকার সমতল ছাদের ‘কালাচাঁদ মন্দির’ রয়েছে। এর ঠিক পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন ল্যাটেরাইট বা মাকড়া পাথরের তৈরি দুর্গা দালান/মণ্ডপ।
শিবালয়: এই চত্বরেই পোড়ামাটির অলঙ্করণে সমৃদ্ধ পঞ্চরত্ন শিব মন্দির এবং সংলগ্ন একাধিক আটচালা শিব মন্দির দেখতে পাওয়া যায়।
৩. রাস মঞ্চ ও কাছারি বাড়ি কমপ্লেক্স (Bandopadhyay Family Complex)
বর্ণনা: গ্রামের ভেতরের অংশে অবস্থিত এই কমপ্লেক্সটির স্থাপত্য মূলত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল।
রাস মঞ্চ: আঠারো শতকের একটি অপূর্ব অক্টোবর-আকৃতির রাস মঞ্চ। এটি নির্মাণশৈলী ও কারুকার্যের দিক থেকে বেশ অনন্য।
অন্যান্য স্থাপত্য: এই কমপ্লেক্সে রয়েছে প্রাচীন কাছারি বাড়ি, তিনটি পঞ্চরত্ন শিব মন্দির এবং অন্যান্য ছোট ছোট মন্দির। কিছু স্থাপত্যে চুন-সুরকি ও ঝিনুকের স্তুকো (Stucco) কাজের প্রভাব দেখা যায়।
৪. বুড়ি মা শীতল মন্দির (Sitala Mata Mandir)
বর্ণনা: গ্রাম্য সংস্কৃতির প্রতীক এই মন্দিরটি এককভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটি স্থানীয়দের কাছে ‘বুড়ি মার থান’ নামেও পরিচিত।
গঠন: এটি একটি ‘রেখ দেউল’ শৈলীর মন্দির এবং উচ্চতায় প্রায় ৪০ ফুট (নবরত্ন মন্দিরের সমতুল্য)। মন্দিরটি এখনও সক্রিয় এবং এখানে নিত্যপূজা হয়।
৫. ধর্মরাজ মন্দির (Dharmaraj Temple)
বর্ণনা: কংসাবতী নদীর পাড়ে গ্রামে ঢোকার পথেই এই ১৯ শতকের মন্দিরটি চোখে পড়ে।
বিশেষত্ব: মন্দিরটিতে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে এবং এর চূড়া ও স্তম্ভের কারুকাজে বিশেষ স্থাপত্যরীতি (সপ্তরথ/ত্রিরথ) ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৬. কংসাবতী নদী ঘাট ও প্রকৃতির সান্নিধ্য
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: মন্দির দর্শনের পাশাপাশি পাথরার কংসাবতী নদীর নির্জন পাড় বেশ মনোরম। বিকেলবেলা নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা এবং গ্রামের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করা এক দারুণ অভিজ্ঞতা দেয়।
৭. জিনশহর (Jinsahar) – নদী পারের প্রাচীন স্থান
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: পাথরার ঠিক বিপরীতে, কংসাবতী নদীর দক্ষিণ পাড়ে ‘জিনশহর’ নামক স্থানে দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন জৈন সংস্কৃতির কিছু ধ্বংসাবশেষ ও নিদর্শন দেখা যায়। সময় থাকলে টোটো নিয়ে নদী পেরিয়ে এটিও ঘুরে দেখা যেতে পারে।
ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ (শীতকাল ও বসন্তকাল) পাথর ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। গরম কম থাকে এবং হেঁটে মন্দিরগুলো দেখার অভিজ্ঞতা ভালো হয়।
কোথায় থাকবেন ও খাবেন?
থাকা: পাথরা একটি ছোট গ্রাম হওয়ায় সেখানে ভালো থাকার মতো হোটেল নেই। সবচেয়ে ভালো হয় মেদিনীপুর শহর বা খড়গপুর শহরে হোটেল নেওয়া। মেদিনীপুর শহরে বিভিন্ন বাজেটের ভালো হোটেল ও লজ পাওয়া যায়।
খাওয়া-দাওয়া: পাথরার আশেপাশে ছোটখাটো চা-চিনির দোকান রয়েছে, তবে ভারী খাবারের জন্য মেদিনীপুর শহরই সেরা। সকালে মেদিনীপুর থেকে খাওয়া-দাওয়া সেরে বের হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
একদিনের ভ্রমণের একটা সহজ প্ল্যান (Itinerary)
সকাল ৮:০০ – ১০:৩০: হাওড়া থেকে ট্রেনে বা গাড়িতে মেদিনীপুর পৌঁছানো।
সকাল ১১:০০: মেদিনীপুর থেকে টোটো/গাড়ি নিয়ে পাথরার উদ্দেশ্যে রওনা।
সকাল ১১:৩০ – দুপুর ২:০০: পাথরার প্রধান মন্দির ক্লাস্টার, নবরাত্র মন্দির, রাস মঞ্চ ও টেরাকোটার কাজ ঘুরে দেখা।
দুপুর ২:৩০: মেদিনীপুর শহরে ফিরে দুপুরের খাবার (Lunch)।
বিকেল ৪:০০: সময় থাকলে মেদিনীপুর শহরের কাছাকাছি বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির বা গোপগড় ইকো পার্ক ঘুরে নেওয়া।
সন্ধ্যা ৬:০০: কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা।
কিভাবে এখানে আসবেন
ট্রেনে: কলকাতা (হাওড়া) থেকে মেদিনীপুর বা খড়গপুরগামী যেকোনো লোকাল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠুন। হাওড়া থেকে খড়গপুর বা মেদিনীপুর পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা। মেদিনীপুর বা খড়গপুর স্টেশন থেকে অটো, টোটো বা ট্যাক্সি ভাড়া করে সোজা পাথরা যাওয়া যায়। দূরত্ব প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার।
সড়কপথে: কলকাতা থেকে কোনানগর বা ধুলগড় হয়ে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে খড়গপুর বাইপাস হয়ে মেদিনীপুর শহরের দিকে যেতে হবে। হাওড়া থেকে দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (সময় লাগবে ৩.৫ – ৪ ঘণ্টা)। নিজের গাড়ি বা বাইক থাকলে একদিনে গিয়ে ঘুরে আসা খুবই সহজ।
