ব্যান্ডেল চার্চ
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক খ্রিস্টীয় তীর্থস্থান হলো হুগলির ব্যান্ডেল চার্চ (The Basilica of the Holy Rosary)। কলকাতা বা সংলগ্ন এলাকা থেকে একদিনের ডে-ট্রিপ বা উইকেন্ড ভ্রমণের জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৫৯৯ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের অনুমতিক্রমে পর্তুগিজ নাবিক ও অগাস্টিনিয়ান ধর্মযাজকদের হাত ধরে ব্যান্ডেল চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৬৩২ সালে সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে মুঘল সেনাপতি কাশিম খাঁ হুগলির পর্তুগিজ ঘাঁটি আক্রমণ করে কাঠের মূল গির্জাটি ধ্বংস করে দেন এবং চার্চের প্রধান পুরোহিত ফাদার জোয়াও দা ক্রুজসহ বহু মানুষকে বন্দি করে আগ্রায় নিয়ে যান। সেখানে এক উন্মত্ত হাতির পায়ের তলায় ফেলে ফাদারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হলে হাতিটি অলৌকিকভাবে তাঁকে আঘাত না করে সসম্মানে শুঁড়ে তুলে নিজের পিঠে বসিয়ে নেয়। এই দৃশ্য দেখে সম্রাট শাহজাহান বিস্মিত হয়ে তাঁদের মুক্তি দেন এবং গির্জা পুনর্নির্মাণের জন্য ৭৭৭ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন। এর ওপর ভিত্তি করে ১৬৬০ সালে পাকা কাঠামোয় চার্চটি পুনর্নির্মিত হয় এবং মুঘল আক্রমণের সময় নদীতে নিখোঁজ হওয়া মারিয়া প্রতিমাটিও অলৌকিকভাবে গঙ্গার তীর থেকে উদ্ধার করে ‘আওয়ার লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ’ নামে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে বঙ্গোপসাগরের বিধ্বংসী ঝড় থেকে বেঁচে ফিরে এক পর্তুগিজ ক্যাপ্টেনের মানত অনুসারে দান করা জাহাজের মাস্তুল চার্চ প্রাঙ্গণে স্থাপিত হয় এবং এই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৮ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল চার্চটিকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ব্যাসিলিকা’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
প্রধান দ্রষ্টব্য ও স্থাপত্য
ব্যান্ডেল চার্চের স্থাপত্যটি মূলত প্রাচীন পর্তুগিজ ও ক্লাসিক্যাল রোমান ক্যাথলিক নির্মাণশৈলীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যার প্রবেশদ্বারের উপরিভাগে রয়েছে একটি বিশাল ঘণ্টাবিশিষ্ট উঁচু মিনার। চার্চের ভেতরের মূল প্রার্থনা কক্ষে বা অলিন্দে রয়েছে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন প্রধান বেদি এবং দেয়াল ও জানালায় খোদাই করা রঙিন কাচের অপূর্ব কারুকাজ (Stained Glass), যেখানে যিশুখ্রিস্টের জীবনের নানা অলৌকিক অধ্যায় চিত্রিত রয়েছে। এই বেদির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ঐতিহাসিকভাবে উদ্ধারপ্রাপ্ত পবিত্র ‘আওয়ার লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ’ মাতা মেরির প্রতিমূর্তি। চার্চ প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য হলো কাচ দিয়ে সুরক্ষিত সপ্তদশ শতকের সেই ঐতিহাসিক কাঠের জাহাজের মাস্তুল, যা ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড় থেকে বেঁচে ফেরা এক পর্তুগিজ ক্যাপ্টেনের মানতের স্মারক। এ ছাড়া চার্চের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে রয়েছে ভক্তদের মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করার নির্দিষ্ট স্থান, যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পথপরিক্রমার ভাস্কর্য (Stations of the Cross) এবং প্রাচীন পর্তুগিজদের স্মৃতিবিজড়িত নানা সমাধিফলক। চার্চের ছাদ ও ব্যালকনি থেকে সংলগ্ন হুগলি নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের এক মনোরম দৃশ্য দেখা যায়, যা এর চার শতাব্দীরও বেশি পুরনো স্থাপত্যের ভাবগাম্ভীর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সময়সূচি ও প্রবেশ তথ্য
খোলা থাকার সময়: প্রতিদিন সকাল ৬:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা / ৫:৩০ টা পর্যন্ত (উৎসবের দিনে সময়সীমা বাড়তে পারে)।
প্রবেশ ফি: সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাস ঘোরার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। বড়দিন (ক্রিসমাস) ও নববর্ষে চার্চ সাজানো হয় এবং প্রচুর ভক্তের সমাগম ঘটে।
একদিনের ট্যুরে আশেপাশের অন্যান্য দ্রষ্টব্য
হুগলি ইমামবাড়া: ব্যান্ডেল চার্চ থেকে মাত্র ২ কিমি দূরে অবস্থিত। এর বিশাল ঘড়ি ও সুন্দর স্থাপত্য নজরকাড়া।
হংসেশ্বরী মন্দির, বাঁশবেড়িয়া: টেরাকোটা ও তান্ত্রিক স্থাপত্যের অনবদ্য নিদর্শন (দূরত্ব প্রায় ৫ কিমি)।
ইমামবাড়ার পেছনের গঙ্গার ঘাট: শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য উপযোগী।
কিভাবে এখানে আসবেন
ট্রেন: হাওড়া স্টেশন থেকে ব্যান্ডেল বা বর্ধমানগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে উঠে ব্যান্ডেল জংশনে নামতে হবে (সময় লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা)। ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে অটো বা টোটো করে চার্চের দূরত্ব প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কিমি।
সড়কপথ: কলকাতা থেকে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (GT Road) বা কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সহজেই গাড়িতে আসা যায় (দূরত্ব প্রায় ৫০-৫৫ কিমি)।
