হংসেশ্বরী মন্দির

হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়ায় অবস্থিত হংসেশ্বরী মন্দির বাংলার অন্যতম অনন্য ও স্থাপত্যশৈলীতে সমৃদ্ধ একটি ঐতিহাসিক তীর্থস্থান। তান্ত্রিক ভাবধারা ও মানবদেহের ষট্‌চক্রের ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী সাধারণ বঙ্গীয় মন্দিরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যের প্রেক্ষাপট

বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির বাংলার সনাতন স্থাপত্যরীতির বাইরে তান্ত্রিক দর্শন ও মানব শারীরস্থানের রূপকে নির্মিত এক অনন্য নিদর্শন। ১৮০১ সালে বাঁশবেড়িয়ার রাজা নৃসিংহদেব রায় বারাণসীতে তন্ত্র ও কুণ্ডলিনী যোগ সাধনা শেষে এই মন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন। ১৮০২ সালে তাঁর অকালমৃত্যুর পর তাঁর তেজস্বিনী দ্বিতীয় স্ত্রী রানি শঙ্করী বহু অর্থব্যয়ে ১৮১৪ সালে মন্দিরটির নির্মাণ সম্পন্ন করেন। মন্দিরটির স্থাপত্য মূলত মানবদেহের ছয়টি চক্র (ষট্‌চক্র) এবং প্রধান তিনটি নাড়ী—ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্নার প্রতীকী রূপ। এটি ছয়তলা বিশিষ্ট এবং এর শীর্ষে রয়েছে প্রস্ফুটিত পদ্মকুঁড়ির ন্যায় সুসজ্জিত ১৩টি রত্ন বা চূড়া, যা সর্বোচ্চ ‘সহস্রার’ চক্রকে নির্দেশ করে। মন্দিরের ভেতরের সিঁড়ি ও প্রবেশপথগুলিও তৈরি করা হয়েছে স্নায়ুতন্ত্র ও নাড়ীপথের জটিল বিন্যাসের আদলে। গর্ভগৃহে রয়েছে একটি অখণ্ড নিমকাঠ দিয়ে তৈরি নীলবর্ণের চতুর্ভুজা মা হংসেশ্বরীর দারুমূর্তি। দেবী আসীন রয়েছেন শায়িত মহাদেবের নাভি থেকে নির্গত সহস্রদল নীলপদ্মের ওপর, যা তন্ত্রের শিব-শক্তি তত্ত্বের মেলবন্ধন। সাধারণ বঙ্গীয় চালা বা টেরাকোটা রীতির বদলে চুন-সুরকি ও অনন্য জ্যামিতিক নকশায় তৈরি এই মন্দির ভারতের অন্যতম দুর্লভ তান্ত্রিক স্থাপত্য।

বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির Hangseshwari Temple, Bansberia
বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির Hangseshwari Temple, Bansberia

অনন্ত বাসুদেব মন্দির (একই চত্বরে)

১৬৭৯ সালে রাজা রামেশ্বর রায় নির্মিত অনন্ত বাসুদেব মন্দিরটি হংসেশ্বরী মন্দির চত্বরে অবস্থিত বাংলার ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। মন্দিরটি মূলত চারচালা কাঠামোর ওপর একটি ছোট রত্ন বা চূড়া সম্বলিত ‘নবরত্ন’ মিশ্ররীতির একচালা শৈলীতে প্রতিষ্ঠিত। এর দেওয়াল, কার্নিশ ও খিলানজুড়ে পোড়ামাটির সূক্ষ্ম ফলকে রামায়ণ ও মহাভারতের পৌরাণিক দৃশ্য, কৃষ্ণলীলা এবং তৎকালীন বঙ্গীয় সামাজিক জীবনের চমৎকার রূপ ফুটে উঠেছে। গর্ভগৃহে বাসুদেব বা ভগবান বিষ্ণুর চতুর্ভুজ বিগ্রহ পূজিত হয়, যা অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে সংরক্ষিত। বর্তমানে এটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI) কর্তৃক সংরক্ষিত জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্মারক হিসেবে অত্যন্ত যত্নসহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। হংসেশ্বরী মন্দিরের তান্ত্রিক স্থাপত্যের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এই শতাব্দীপ্রাচীন পোড়ামাটির মন্দিরটি ইতিহাস ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য এক প্রধান আকর্ষণ।

বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির Hangseshwari Temple, Bansberia

সময়সূচি ও ভ্রমণ তথ্য

 দর্শনের সময়: সকাল ৬:০০ টা থেকে বেলা ১২:৩০ টা এবং বিকেল ৪:০০ টা থেকে রাত ৮:০০ টা (গ্রীষ্ম/শীতকাল ভেদে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে)।

 ভোগের ব্যবস্থা: দুপুর ১২টার মধ্যে মন্দিরে যোগাযোগ করলে নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে ভোগ কুপন সংগ্রহ করে মধ্যাহ্নভোজন করা যায়।

 আশেপাশের দর্শনীয় স্থান: ব্যান্ডেল চার্চ, ইমামবাড়া এবং দেবানন্দপুর (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মভিটা)।

বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির Hangseshwari Temple, Bansberia

কিভাবে এখানে আসবেন

ট্রেন পথে: হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাটোয়া, কাটোয়া লোকাল বা নবদ্বীপধাম লোকাল ধরে বাঁশবেড়িয়া (Bansberia) স্টেশনে নামতে হবে। স্টেশন থেকে অটো বা টোটো করে ৫-১০ মিনিটে মন্দিরে পৌঁছানো যায়। ব্যান্ডেল স্টেশন থেকেও অটো বা টোটো যোগে সরাসরি যাওয়া যায় (দূরত্ব প্রায় ৪ কিমি)।

সড়ক পথে: কলকাতা থেকে দিল্লি রোড বা জিটি রোড (GT Road) হয়ে ব্যান্ডেল অতিক্রম করে বাঁশবেড়িয়া পৌঁছানো যায়। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ৫০-৫৫ কিমি (সময় লাগে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা)।

Google Maps

Scroll to Top