ইমামবাড়া
হুগলি ইমামবাড়া পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শিয়া মুসলিম ধর্মীয় স্থান ও স্থাপত্য নিদর্শন। ১৮৪১ সালে দানবীর হাজী মহম্মদ মহসীন-এর স্মরণে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৮৬১ সালে শেষ হয়।
প্রধান দর্শনীয় স্থান ও আকর্ষণ
১. ক্লক টাওয়ার ও টুইন মিনার
প্রবেশদ্বারের ঠিক ওপরে অবস্থিত এই টাওয়ারটির উচ্চতা প্রায় ৮৫ ফুট। এর দুই পাশে দুটি সুউচ্চ প্রতিসম মিনার রয়েছে। প্রতিটি মিনারে ওঠার জন্য রয়েছে ১৫২টি সরু ঘোরানো সিঁড়ির ধাপ। একসময় পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা মিনার নির্ধারিত ছিল। মিনারের চূড়ায় পৌঁছালে পুরো ইমামবাড়া চত্বর, হুগলি নদীর প্রবাহ এবং জুবিলি ব্রিজের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়।
২. ঐতিহাসিক মেকানিক্যাল ক্লক
মিনারের মাঝামাঝি অংশে অবস্থিত বিশাল ঘড়িটি ১৮৫২ সালে লন্ডনের বিখ্যাত প্রস্তুতকারক মেসার্স ব্ল্যাক অ্যান্ড মারে (Black & Hurray) থেকে তৎকালীন ১১,৭২১ টাকায় কেনা হয়েছিল।
ঘড়ির মূল যন্ত্রাংশের ওজন কয়েক কুইন্টাল।
এতে দুটি প্রকাণ্ড তামার ঘণ্টা রয়েছে—ছোটটির ওজন প্রায় ৮০ মণ এবং বড়টির ওজন প্রায় ১৪০ মণ।
ঘড়ির পেণ্ডুলাম এবং দম দেওয়ার চাবি দুটি অত্যন্ত বিশালাকার, যা দেখতে পর্যটকেরা ভিড় করেন।
৩. জরিদালান (মূল প্রার্থনা কক্ষ)
ইমামবাড়া চত্বরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত দোতলা উচ্চতার এই মূল প্রার্থনা হলটি আভিজাত্যের প্রতীক।
অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা: মেঝেময় চকচকে মার্বেল পাথর, সিলিং থেকে ঝুলন্ত ইউরোপীয় ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি এবং রঙিন বেলজিয়াম কাঁচের লণ্ঠন।
দেয়ালচিত্র ও ক্যালিগ্রাফি: দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে পবিত্র কোরআনের নানা আয়াত এবং কারবালার যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন।
তাজিয়া ও মিম্বর: মহরমের সময় ব্যবহৃত রুপা ও কাঠের কারুকার্যময় তাজিয়া এবং ধর্মোপদেশের জন্য নির্মিত সুদৃশ্য কাঠের মিম্বর (সিঁড়িযুক্ত আসন) এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
৪. উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ও আয়তাকার জলাশয় (হৌজ)
ইমামবাড়ার ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একটি সুবিশাল মার্বেল বাঁধানো খোলা চত্বর। চত্বরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ আয়তাকার জলাশয় বা ফোয়ারা। এই জলাশয়টি নামাজের আগে অজু করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। দুই পাশের দ্বিতল廊 (করিডোর)-এর খিলানযুক্ত নকশা পুরো চত্বরটিকে একটি রাজকীয় রূপ দেয়।
৫. সূর্যঘড়ি (Sun Dial)
ভবনের পেছনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে গঙ্গার দিকে মুখ করে পাথরের ওপর একটি প্রাচীন সূর্যঘড়ি বসানো রয়েছে। সূর্যের আলো ও ছায়ার অবস্থান মেপে নিখুঁত স্থানীয় সময় ও নামাজের ওয়াক্ত বের করার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল।
৬. হাজী মহম্মদ মহসীনের সমাধি ও গঙ্গার ঘাট
ইমামবাড়ার ঠিক পেছনেই হুগলি নদীর শান্ত তীর ঘেঁষে তৈরি প্রশস্ত ঘাট রয়েছে। কাছেই একটি পরিচ্ছন্ন বাগানের মধ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ইমামবাড়ার প্রতিষ্ঠাতা দানবীর হাজী মহম্মদ মহসীন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
৭. গঙ্গার ঘাট ও শান্ত পরিবেশ
ভবনের পেছনের অংশটি সরাসরি হুগলি নদীর ঘাটের সাথে যুক্ত। এখানে বসে নদী ও শান্ত পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
প্রয়োজনীয় তথ্য
সময়সূচি: সাধারণত প্রতিদিন সকাল ৮:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে (নামাজের সময় কিছু অংশ সাময়িক বন্ধ থাকতে পারে)।
প্রবেশমূল্য: নামমাত্র প্রবেশ টিকিট (সাধারণত প্রতি ব্যক্তি ₹১০ থেকে ₹২০)।
পাশাপাশি ঘোরার জায়গা: একই দিনে কাছেই থাকা ব্যান্ডেল চার্চ, হংসেশ্বরী মন্দির এবং ইমামবাড়ার প্রতিষ্ঠাতা হাজী মহম্মদ মহসীনের সমাধি দেখে নেওয়া যায়।
কিভাবে এখানে আসবেন
ট্রেন: হাওড়া স্টেশন থেকে ব্যান্ডেল বা বর্ধমান লোকাল ধরে নেমে পড়ুন হুগলি স্টেশন অথবা ব্যান্ডেল জংশন-এ। সেখান থেকে টোটো বা অটোয় সরাসরি ইমামবাড়া
পৌঁছানো যায় (দূরত্ব প্রায় ২-৩ কিমি)।
সড়কপথ: কলকাতা থেকে জিটি রোড বা দিল্লি রোড ধরে ডানকুনি ও চন্দননগর পার হয়ে সহজে গাড়িতে আসা যায়। সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।
জলপথ: উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি ফেরিঘাট থেকে লঞ্চ বা নৌকায় নদী পেরিয়ে হুগলি ঘাটে এসে সেখান থেকে টোটো নেওয়া যায়।
